লিখেছেন - আনিসুল হক বিষয় - আত্মজীবনীমূলক
সংগ্রহ করা হয়েছে - প্রথম আলো থেকে
How sickness enlarges the dimensions of a man's self to himself! He is his own exclusive object. Supreme selfishness is inculcated upon him as his only duty ... He changes sides oftener than a politician. Now he lies full length, then half length, obliquely, transversely, head and feet quite across the bed; and none accuses him of tergiversation − চার্লস ল্যাম্ব
জ্বি, আমি আনিসুল হক৷ এখনো বেঁচে আছি, আবারও কি-বোর্ডে হাত রাখছি৷ শত্রুর মুখে দিয়ে ছাই, আমার প্রাণহানির কোনো আশঙ্কাই আপাতত নাই৷ চোখের সামান্য ওপরে কপালজুড়ে যে ক্ষতটা ছিল, সাতটা সেলাই পড়েছে যেটায়, বাঁ চোখের নিচের পাতায় একটা সেলাইসমেত ক্ষতটা, আর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচে যে ইঞ্চি-দেড়েক গভীর জখমটা ছিল, সবই শুকিয়ে যাচ্ছে, সেরে উঠছে৷ শুধু আমি জানি না, আমার ডান পায়ের কী অবস্থা৷ ওটা বেশ ফুলে গিয়েছিল৷
চিকিত্সকেরা এক্স-রের পরে যখন বললেন, হাড় ভাঙেনি, এমনকি সিটি স্ক্যানের রিপোর্টও ভালো, তখন আমার বিপদাশঙ্কায় ছুটে আসা বন্ধুদের অকারণে ব্যাতিব্যস্ত করে তোলার লজ্জায় আমি কেন্নোর মতো কুঁচকে গিয়েছিলাম৷ সত্যি তাদের প্রত্যাশা আমি তখন পূরণ করতে পারিনি৷ কিন্তু ভিড়টা একটু কমে গেলে চিকিত্সকগণ বললেন, তোমার ডান হাঁটুর সফট টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ হাড় ভাঙেনি, এতে খুশির কিছু নেই৷ কারণ ভাঙা হাড় জোড়া লাগবেই৷ টিস্যু বা লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটা সারানো বড় কষ্ট৷ শুনে খারাপ লাগল, বন্ধুদের এই তথ্যটা জানানো হলো না৷ তাহলে অতটা হতাশ হয়ে ওদের ফিরতে হতো না৷
অর্থোপ্যাডিক্সের নামকরা চিকিত্সক আমার ডান হাঁটুতে সুচ ঢুকিয়ে ভেতরে জমা অবাঞ্ছিত তরল বের করে দিয়ে পা-টা প্রায় প্লাস্টার করে দিয়েছেন৷ প্রথমে বলা হয়েছিল, চার-পাঁচ দিন লাগবে৷ তারপর বলা হলো, এক সপ্তাহ৷ এখন সেটা তিন সপ্তাহে গিয়ে ঠেকেছে৷ আমি অনড় ডান পা নিয়ে বিছানায় পড়ে আছি৷ বসা থেকে শোওয়া বা শোওয়া থেকে বসার জন্যে দুজন সহকারী লাগে৷ তাঁরা আগে আগে মাতব্বরের হুঁকার মতো আমার ডান পাটা নিয়ে যান৷ ফলে চার্লস ল্যাম্ব যে বলেছিলেন, রোগীরা ইচ্ছামতো বিছানায় শুতে পারে, রাজনীতিবিদদের চেয়েও ঘন ঘন পাশ বদলাতে পারে, আমার বেলায় সেটা সত্য নয়৷ আমি মোটেও পাশ ফিরতে পারি না৷
আমি আমার এই নতুন দশা উপভোগ করতে শুরু করেছি৷ পিজির গোয়ালঘর-মার্কা টিনশেড এমার্জেন্সিতে যখন একজন ওয়ার্ডবয় (ডাক্তার নন, একজন সদাশয় টেকনিশিয়ান) আমার কপালে সেলাই দিতে উদ্যত হলেন, আমি তাঁকে বললাম, ভাই, আমার চেহারাটা যেন সুন্দর থাকে, ডাকাতের মতো দাগি না দেখায়৷ উনি আশ্বস্ত করেছিলেন, সবচেয়ে দামি সুতাই আমাকে দেওয়া হচ্ছে৷ আমার এই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে একটা রম্যরচনা আমি রস+আলোর জন্যে লিখছি৷ তাতে আপনারা বিস্তারিত জানতে পারবেন৷
আমার মাথা ঠিক আছে (সব পাগলই যেটা দাবি করে থাকে), আমার হাতের ১০টা আঙ্গুল পুরোপুরি অক্ষত, সুতরাং আপনাদের জন্যে ভয়াবহ দুঃসংবাদ হলো আমার লেখার অত্যাচার থেকে আপনারা আপাতত রেহাই পাচ্ছেন না৷ শুধু একটাই চিন্তা, আমার ডান পা দিয়ে আমি আর কোনোদিন এই ধূলির ধরায় পা রাখতে পারব কি না৷ আর সে ক্ষেত্রে আমার ডান পায়ের পদধূলি নেওয়া থেকে আগ্রহীদের বঞ্চিত থাকতে হবে৷
তবে বাংলা সাহিত্যের স্বঘোষিত মোড়লেরা খুব খুশি, তাঁরা একে অন্যকে অভিনন্দন জানিয়ে বলছেন, ও তো চার হাত-পায়ে লিখত, একটা পা কাজ না করায় ও আর আগের মতো ছাইভস্ম লিখে সাহিত্যের বর্জ্যভাণ্ডার ভরাতে পারবে না৷তাঁদের জন্যেও হতাশাজনক খবর অপেক্ষা করছে৷ আমি এক জোড়া ক্রাচ পেয়ে গেছি, ফলে এখন আমার পায়ের সংখ্যা সাড়ে তিন৷ সাড়ে পাঁচটা হাত-পা নিয়ে আমি আগের চেয়ে বেশি বই কম লিখব না৷
মেরিনা আমাকে একটা ছোট্ট টেবিল বানিয়ে দিয়েছে, সেটা আমার দুই পায়ের ওপরে পেতে তার ওপরে ল্যাপটপ রেখে পিঠে বালিশ গুঁজে বিছানায় আধবসা অবস্থায় আমি এই লেখাটা লিখছি৷ আরও ভয়ের ব্যাপার হলো, কিছুদিন বাসায় শুয়ে থাকতে হলে আমি আমার সংগ্রহে থাকা বিশ্বসাহিত্যের সমসাময়িক ধ্রুপদীগুলো পড়ে ফেলতে পারি৷ যার প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে বাধ্য৷
না না, ভয় পাবেন না৷ আমি রসিকতা করছি৷ মিলান কুন্ডেরা নামের এক চেক ভদ্রলোকের অল্পকিছু লেখা পড়ে আমার অল্পবিদ্যের পেটে একটু গণ্ডগোল হয়েছে, এ তারই প্রতিক্রিয়া৷ ভদ্রলোক বলেছিলেন, প্রতিটা জিনিসেরই একটা হালকা দিক আছে, হাস্যরসের দিক আছে, এমনকি মৃত্যু বা সেক্সের মতো আপাতজটিল বিষয়েরও আছে হালকা হাস্যরসাত্মক দিক৷
সেদিন ছিল শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি৷ শেরাটন হোটেলের মোড় পেরিয়ে গেছে আমার ত্রিচক্রযান৷ বইমেলায় যাচ্ছি৷ বাঁয়ে বারডেম, ডানে পিজি৷ সামনে একটা বাস৷ আমার সিএনজি চালিত স্কুটার থামল৷ পেছন থেকে আরেকটা বাস আমাদের ধাক্কা দিয়ে বসল৷ না, বসল না, চলতেই থাকল৷ দুই বাসের চিপায় পড়ে আমাদের স্কুটার মুহূর্তে দোমড়ানো একটা ঠোঙা৷ আমার মাথার রক্ত মুখে আসায় নোনতা স্বাদ পাচ্ছি৷ পরনের পাঞ্জাবি লাল৷ বুঝলাম, অ্যাকসিডেন্ট করেছি৷ এবার নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করা দরকার৷ কিন্তু বেরোতে পারছি না৷ আমিও না, স্কুটারওয়ালাও না৷ পা আটকে গেছে৷ দরজা ছোট হয়ে গেছে৷ সামনের বাসটা খানিকক্ষণ পরে নড়ল৷ আমি বেরিয়ে এলাম৷
স্কুটারের গ্যাস সিলিন্ডারটা বিস্কোরিত হতে পারত, হয়নি৷ আমি ভাঙা স্কুটারের সামনে গিয়ে শুয়ে পড়লাম৷ পরে যারা ওই ধ্বস্ত ত্রিচক্রযানটা দেখেছেন, তাঁরা বলেছেন, এর ভেতর থেকে কেউ বেঁচে ফিরতে পারে, এটা অবিশ্বাস্য৷ থ্যাংক গড৷ আমি জানি, ওই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার পরেও আমি কেন অল্পের ওপর দিয়ে বেঁচে আছি৷ কী কারণে জানি না, ছোটবেলা থেকেই আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আসছি৷ মানুষের শুভ কামনা আমার সঙ্গে আছে৷ সত্য বটে, লেখায় ও আচরণে আমি অনেক মানুষকে আঘাতও দিয়েছি৷ তাঁরা সেসব নিজগুণে ক্ষমা করেছেন নিশ্চয়ই৷
আমাকে হাসপাতালে দেখতে এসেছিল বুয়েটের ছাত্র আতিকুর রহমান হৃদয়৷ ও কিছু বলছিল না, একটা যুদ্ধবিজয়ী প্রসন্ন হাসিতে ওর মুখটা ভরে ছিল৷ ও ভালো আছে দেখে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল৷ সারা বাংলাদেশের বন্ধুসভার বন্ধুরা আছে৷ আর আছে নাম জানা ও না জানা পাঠকেরা৷ কেউ বলেছেন, তাঁরা আমার জন্যে নামাজ পড়েছেন৷ কেউ বলেছেন, মিলাদ শরিফ পড়ানো হচ্ছে৷ টুনটুন বাউল মাজারে শিরনি দিয়েছেন৷ কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন, আনিস, তোমার বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে বা কোনো ব্যাপারে প্রয়োজন হলে ফোন কোরো৷ গত একটা যুগ আমি হেলাল ভাইয়ের খোঁজ নিইনি৷ তবু কত ভালোবাসা এই দেশে মানুষের জন্যে মানুষের৷
প্রবাসী বন্ধুরা, স্বজনেরা, সুব্রতদা, তপনদা, মনজু-সীমা, মাহমুদ-মিঠু, এলএ থেকে বাচ্চু ভাই, মেলবোর্ন থেকে নাহিদ আপা, লুত্ফর ভাই কত জন যে ফোন করেছেন৷ আনিসুজ্জামান স্যার দুর্ঘটনার রাতেই ছুটে এসেছিলেন হাসপাতালে, সপরিবারে৷ জুয়েল আইচ দুবেলা আসতে লাগলেন৷ এখলাস উদ্দিন আহমদ, সৈয়দ আবুল মকসুদ, মতি ভাই, মাহফুজ আনাম, ট্রান্সকমের লতিফুর রহমান সাহেব সবাই আসছেন৷ পরের দিন সকালবেলা কাগজ পড়েই ছুটে এলেন মতিয়া চৌধুরী৷ অথচ আমি বজলু ভাইয়ের শেষকৃত্যে যেতে পারলাম না৷ বজলু ভাই কত দিন আমার কলাম পড়ে আমাকে ফোন করে লেখার সমালোচনা করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন৷ মতিয়া আপার মুখটা টিভি পর্দায় দেখে তাঁর মনের খবরটা পড়ার চেষ্টা করছি৷
আমার বুয়েটের বন্ধুরা, নাটকের বন্ধুরা, লেখক বন্ধুরা, সাংবাদিক ভাইয়েরা, মিলন ভাই, নাঈম ভাই, সাগর ভাই, আফজাল ভাই, মোহিত কামাল, কাজী মাহমুদুর রহমান, আখতার হুসেন, মাহফুজ আহমেদ, শমী কায়সার কতজন যে আসছেন, যাচ্ছেন৷ অবশ্য মেরিনাকে যাঁরা ফোন করেছেন, মেরিনা তাঁদের বারণ করে দিয়েছিল, যেন তাঁরা হাসপাতালে না আসেন৷ হাসপাতালের গেট থেকে ঢুকতে না পেরে বিদায় নিয়েছেন অনেকেই (যেমন কবি রফিক আজাদ)৷ এসেছেন উদ্বিগ্ন প্রকাশকেরা আর প্রযোজকেরা! আমি তাঁদের অভয় দিয়ে বলেছি, স্ক্রিপ্টের চিন্তা করবেন না, আসলে তো আমি ঠ্যাং দিয়ে লিখি না৷ ১০ আঙ্গুলে লিখি, আঙ্গুল ১০টা ঠিক আছে৷
দেশ-বিদেশ থেকে শত শত ফোন এসেছে৷ আমার ফোন মেরিনা বন্ধ করে দিয়েছিল৷ ওর ফোন তো বটেই, আমার আরও চার ভাইবোনের ফোন, আমার সহকর্মীদের সবার ফোনের ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল, গলা বসে গিয়েছিল আমার কুশল জানাতে জানাতে৷ আমি জানি, এই হলো বাংলাদেশ, একে অন্যের বিপদে মানুষ এভাবেই ছুটে আসে৷ এ জন্যেই তো কবির এই কথা সব সময় আমার হৃদয়ে বাজতে থাকে, ভাইয়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ, ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি, আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি৷
আমি এই লেখার মাধ্যমে যাঁরা আমার সুস্থতা কামনা করেছেন, আমার জন্যে উদ্বিগ্ন হয়েছেন, একে অন্যের কাছে আমার কুশল জানতে চেয়েছেন, তাঁদের সবার কাছে আমার ও আমার পরিবারের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি৷ আপনাদের ভালোবাসায় জগদ্দল পাথর আমার ডান পাও নিশ্চয়ই সেরে যাবে৷ প্রথম আলো প্রথম দিন থেকেই স্কুটারটির হতভাগ্য চালকের চিকিত্সার দেখভাল করছে৷ তিনিও ভালো আছেন৷
আনিসুল হক (anisulhoquem@yahoo.com)
- কবি, লেখক ও সাংবাদিক