ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু

লিখেছেন - হুমায়ূন আহমেদ    বিষয় - হিমুর কাহিনী

সংগ্রহ করা হয়েছে - বাংলাদেশ ইনফো ডট কম থেকে

   

ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু
নয় নম্বর বিপদ সংকেত
হিমুর পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ
হিমু হওয়ার নিয়মাবলি
অসুস্থতা নাকি অন্য কিছু?
হিমু সড়ক
একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম-মৃত্যু
হিমুর বিয়ে
বালক হিমু
 

ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি৷ লেকচারার থেকে অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর হয়েছি৷ বেতন বাড়েনি, যন্ত্রণা বেড়েছে৷ আমাকে দূর-দূরান্তরে পরীক্ষা নিতে পাঠানো হচ্ছে৷ পটুয়াখালী, বরিশাল, ফরিদপুর৷ কলেজগুলোতে পড়াশোনা হয় না বললেই চলে৷ প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের সুযোগ-সুবিধাও নেই৷ ছাত্ররা কিছুই পারে না৷ অতি সহজ প্রশ্নে মাথা চুলকায়, ঘাড় চুলকায়৷ মাথা এবং ঘাড় থেকে প্রশ্নের উত্তর আসে না৷

অনার্স পরীক্ষা দিচ্ছে এমন ছেলেকে যখন জিজ্ঞেস করি, পানির ফর্মূলা কী? সে আমতা আমতা করে বলে, H2O৷ যেন তার সন্দেহ আছে আসলেই H2O কিনা৷ তারপর জিজ্ঞেস করি, D2O কী? যারা কেমিস্ট্রি জানেন না তাদের বলছি, D2O হচ্ছে হেভি ওয়াটার৷ হাইড্রোজেন অ্যাটমে প্রটোন থাকে একটা, এখানে দুটা৷ D হলো হাইড্রোজেনের একটা Isotope৷ অতি সহজ এই প্রশ্নে পরীক্ষার্থী পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে বলে, স্যার হচ্ছে D2O ঢাকার পানি৷ তাহলে রাজশাহীর পানির ফর্মূলাটা কী? স্যার R2O৷ বরিশালের পানি? স্যার B2O৷ বরগুনার পানি? এইবার ছাত্র উৎসাহী৷ সে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে৷ সে হাসিমুখে জবাব দেয়, বরগুনার পানিরও স্যার একই ফর্মূলা B2O

আমি হতাশ চোখে পরীক্ষার্থীর দিকে তাকিয়ে থাকি৷ ইন্টারনাল একজামিনার হাত কচলাতে কচলাতে বলেন, পাস করিয়ে দিতে হবে স্যার৷ গরিবের ছেলে৷ কষ্ট করে লেখাপড়া করছে৷ ভাবটা এ রকম যে, ধনীর ছেলেমেয়েদের কেমিস্ট্রি জেনে পাস করতে হবে৷ গরিবের ছেলের পাসটা প্রয়োজন৷ কেমিস্ট্রি জানা প্রয়োজন না৷

বাইরে পরীক্ষা নিতে গেলে ভাইভা বিষয়ক অতি ক্লান্তিকর অবস্থার ভেতর যেতে হয়৷ ছাত্রদের ফেল করাতে ইচ্ছা করে না, আবার পাস করাতেও ইচ্ছা করে না৷ ভাইভা নিতে কষ্ট৷ থাকা-খাওয়াতেও কষ্ট৷

এক্সটারনাল শিক্ষকদের থাকার জায়গা হয় সাধারণত ল্যাবরেটরির লাগোয়া ঘরে৷ উদাহরণ বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ৷ সেখানে পরীক্ষা নিতে গিয়ে ওই ঘরে অনেকদিন থেকেছি৷ একবার ভূতও দেখেছিলাম৷ যেসব কলেজে এ রকম কোনো ঘর নেই সেখানে থাকার ব্যবস্থা হয় কোনো শিক্ষকের বাসায়৷ ভদ্রলোক হয়তো পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করছেন, সেখানে মূর্তিমান উপদ্রবের মতো অচেনা অজানা একজন মানুষ থাকতে আসেন৷ যাকে আপন করে নেওয়া যায় না, আবার দূরেও ঢেলে রাখা যায় না৷

এক্সটারনাল ভদ্রলোক ইচ্ছা করলেই ভাইভায় প্রচুর ফেল করিয়ে ঝামেলা করতে পারেন৷ একবার কেমিস্ট্রির এক শিক্ষকের বাসায় আমার থাকার জায়গা হলো৷ ভদ্রলোকের বাসায় একটা বাথরুম৷ সেই বাথরুম স্বামী-স্ত্রীর শোবার ঘরের সঙ্গে এটাচড৷ আমার আবার রাতে কয়েক দফা বাথরুমে যেতে হয়৷ ভদ্রলোক অবশ্য খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, আমার শোবার ঘরের দরজা খোলা থাকবে৷ আপনার যতবার ইচ্ছা বাথরুমে যাবেন৷ কোনো সমস্যা নেই৷

দীর্ঘ ভূমিকা দিলাম, এখন মূল গল্পে আসি৷ আমি পরীক্ষা নিতে গেছি পটুয়াখালীতে৷ ল্যাবরেটরির পাশের টিচার্স রুমে খাট পেতে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ গরমকাল৷ বেশির ভাগ সময় ইলেকট্রিসিটি নেই৷ ফ্যান চলে না৷

প্রথম রাতে একফোঁটা ঘুম হলো না৷ বিছানায় এপাশ-ওপাশ করি৷ রাত তিনটায় মশারির ভেতর থেকে বের হলাম৷ সঙ্গে সঙ্গে শত শত মশা আমাকে ছেঁকে ধরল৷ আবার মশারির ভেতর ঢুকলাম৷ গরমে টিকতে না পেরে আবার বের হলাম৷ মশাদেরকে বললাম, তোমরা যারা এখানে আছ তারাই আমার রক্ত খাও, বাইরে থেকে কাউকে ডেকে এনো না৷ ঘরটাকে আমার মনে হলো হাজতখানা৷ এই হাজতে সাতটা রাত পার করতে হবে ভেবে খুবই দমে গেলাম৷ এর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় কীভাবে? হঠাৎ করে মনে হলো একটা নদী কল্পনা করলে কেমন হয়?

নদীর পাড়ে একটা গাছের নিচে আমি বসে আছি৷ উথাল পাতাল হাওয়া নদীর উপর দিয়ে উড়ে আসছে৷ এমন হাওয়া যে আমার সামান্য শীত শীত ভাব হচ্ছে৷ আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মশক বানিহীকে সম্পূর্ণ অগ্রহ্য করে নদী কল্পনা শুরু করলাম৷ নদীর একটা সুন্দর নামও দিলাম - ময়ূরাক্ষী৷ যারা আমার লেখা পড়ছেন তারা হয়তো পুরোপুরি বিশ্বাস করবেন না যে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার গরম লাগা কমে গেল৷ নদীর প্রবল হাওয়ায় মশারা উড়ে গেল৷ আমার খানিকটা শীত শীতও করতে লাগল৷

এভাবেই তৈরি হলো হিমু, যে যেকোনো অবস্থায় কল্পনার নদী ময়ূরাক্ষীর কাছে চলে যেতে পারে৷ হিমুকে নিয়ে লেখা আমার প্রথম উপন্যাসটির নাম ময়ূরাক্ষী৷ ময়ূরাক্ষীর হিমু আমি নিজে৷ প্রথম লেখা হিমু বিষয়ক বইয়ে ময়ূরাক্ষী নদী কীভাবে চলে এল, একটু দেখা যাক৷

ছোটবেলার কথা৷ ক্লাস সিক্সে পড়ি৷ জিওগ্রাফি পড়ান মফিজ স্যার৷ তিনি ক্লাসে ঢুকলে চেয়ার-টেবিলগুলো পর্যন্ত ভয়ে কাঁপে৷ স্যার মানুষটা ছোটখাটো, কিন্তু হাতের থাবাটা বিশাল৷ আমাদের ধারণা ছাত্রদের গালে চড় বসাবার জন্য আল্লাহতালা স্পেশালভাবে স্যারের এই হাত তৈরি করে দিয়েছেন৷ স্যারের চড়েরও নানা নাম ছিল - রাম চড়, শ্যাম চড়, যদু চড়, মধু চড়৷

এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন চড় হচ্ছর রাম চড়, সবচেয়ে নরমটা হচ্ছে মধু চড়৷ স্যার সেদিন পড়াচ্ছেন - বাংলাদেশের নদ-নদী৷ ক্লাসে ঢুকেই আমার দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন, এই একটা নদীর নাম বল তো৷ চট করে বল৷ মফিজ স্যার কোনো প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণের জন্য আমার মাথাটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়৷ কান ভোঁ ভোঁ করতে থাকে৷ মনে হয় মাথার খুলির ভেতর জমে থাকা কিছু বাতাস কানের পর্দা ফাটিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে৷

কী ব্যাপার চুপ করে আছিস কেন? নাম বল৷ আমি ক্ষীণস্বরে বললাম, আড়িয়াল খাঁ৷ স্যার এগিয়ে এসে প্রচণ্ড চড় বসিয়ে দিলেন৷ খুব সম্ভব রাম চড়৷ হুঙ্কার দিয়ে বললেন, এত সুন্দর সুন্দর নাম থাকতে তোর মনে এল আড়িয়াল খাঁ? সব সময় ফাজলামি? কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাক৷ আমি কানে ধরে সারাটা ক্লাস দাঁড়িয়ে রইলাম৷ ঘন্টা পড়ার মিনিট পাঁচেক আগে পড়ানো শেষ করে স্যার চেয়ারে গিয়ে বসলেন৷ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কাছে আয়৷

আরেকটি বড় খাবার জন্য আমি ভয়ে ভয়ে স্যারের কাছে এগিয়ে গেলাম৷ তিনি বিষন্ন গলায় বললেন, এখনো কানে ধরে আছিস কেন? হাত নামা৷ আমি হাত নামালাম৷ স্যার ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, তোকে শাস্তি দেওয়াটা অন্যায় হয়েছে, খুবই অন্যায়৷ তোকে নদীর নাম বলতে বলেছি, তুই বলেছিস৷ আয় আরও কাছে আয়, তোকে আদর করে দেই৷

স্যার এমন ভঙ্গিতে মাথায় এবং পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন যে আমার চোখে পানি এসে গেল৷ স্যার বিব্রত গলায় বললেন, আমি তোর কাছ থেকে সুন্দর একটা নদীর নাম শুনতে চেয়েছিলাম, আর তুই বললি আড়িয়াল খাঁ৷ আমার মেজাজটা গেল খারাপ হয়ে৷ আচ্ছা এখন সুন্দর একটা নদীর নাম বল৷ আমি শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে বললাম ময়ূরাক্ষী৷

ময়ূরাক্ষী? এই নাম তো শুনিনি৷ কোথাকার নদী?

জানি না স্যার৷

এই নামে আসলেই কি কোনো নদী আছে?

জানি না স্যার৷

স্যার হালকা গলায় বললেন, আচ্ছা থাক৷ না থাকলে নেই৷ এটা হচ্ছে তোর নদী৷ যা জায়গায় গিয়ে বস৷ এমনিতেই তোকে শাস্তি দিয়ে আমার মনটা খারাপ হয়েছে৷ তুই তো দেখি কেঁদে কেঁদে আমার মন খারাপটা বাড়াচ্ছিস৷ আর কাঁদিস না৷

 

নয় নম্বর বিপদ সংকেত

পাঠকরা ভুলেও ভাববেন না ময়ূরাক্ষী বের হওয়ার পর পরই যুবক শ্রেণীর বিরাট অংশ হলুদ পাঞ্জাবী পরে রাস্তায় নেমে গেল৷ আমিও মনের আনন্দে একের পর এক হিমু বাজারে ছাড়তে লাগলাম৷ পাশ বইয়ের খাতায় টাকা জমা হতে লাগল৷ শুরুতে হিমুকে আমি মোটেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করিনি৷ তখন আমার প্রিয় চরিত্র মিসির আলি৷ আমি লিখছি মিসির আলি৷ এই ভদ্রলোকের লজিকে এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতায় আমি মুগ্ধ৷

এর মধ্যে আমার অর্থনৈতিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হয়েছে৷ বন্ধু-বান্ধব, ব্যাংক এবং প্রকাশকদের কাছ থেকে ধার করে এলিফ্যান্ট রোডে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছি৷ পনেরশ স্কয়ার ফিটের ছোট্ট ফ্ল্যাট৷ তাতে কী, দুটো বেডরুম আছে৷ একটা বারান্দা আছে৷ বারান্দায় বসলে সুন্দর কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে পাই না৷ জুতার দোকান দেখতে পাই৷ ছয়তলা থেকে জুতার দোকান দেখা খারাপ কিছু না৷

বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে আমি জুতার দোকান দেখি এবং পরের লেখাটা কী হবে ভাবি৷ আমার তিন মেয়ে তখন সামান্য বড় হয়েছে৷ বড় মেয়েটি ক্লাস সিক্সে পড়ে, মেজোটি পড়ে ক্লাস ফোরে৷ ভোরবেলা স্কুলের পোশাক পরে তারা কিছুক্ষণ ধবল রঙের ডিপফ্রিজের সামনে দাঁড়ায়৷

কারণ তাদের বাবা রাতে যা লিখেছে তা ডিপফ্রিজের উপর সাজানো থাকে৷ আমার এই দুই কন্যা বাবার লেখার সর্বশেষ অংশ না পড়ে স্কুলে যাবে না৷ আমার লেখক জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার পেয়েছি বলে মনে পড়ে না৷ আমার এই দুই কন্যার কোনো একজন, খুব সম্ভব বড়জন আমাকে একদিন বলল, বাবা ময়ূরাক্ষীর মতো আরেকটা বই লেখ৷ হিমুর বই৷

হিমুকে নিয়ে কন্যার আগ্রহে লিখে শেষ করলাম দরজার ওপাশে৷ বই প্রকাশিত হলো৷ আমি পড়লাম মহাবিপদে৷ হাইকোর্টে বিচারকদের সমিতি আছে৷ সমিতির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হলো, এই বইটি লিখে আমি মহা অন্যায় করেছি৷ মহান বিচারকদের সম্মান ধুলায় লুটিয়ে দিয়েছি৷ কারণ আমি লিখেছি জজ সাহেবরা ঘুষ খান৷

উপন্যাসে ঘটনাটা এ রকম - হিমুর মাতুল বংশ পিশাচ শ্রেণীর৷ তারা হেন দুষ্কর্ম নাই যা করে না৷ তাদের ধারণা যেকোনো কাজ টাকা দিয়ে করানো সম্ভব৷ তাদেরই একজন জজ সাহেবকে ঘুষ দিয়ে এই কাজটা করাতে চাচ্ছে৷ জজ সাহেবরা ঘুষ খান - এটি হিমুর ধান্ধাবাজ মামার কথা৷ বইতে কিভাবে এসেছে দেখা যাক৷

মামা গোসল করে জায়নামাজে বসে গেলেন৷ দীর্ঘ সময় লাগল নামাজ শেষ করতে৷ তার চেহারা হয়েছে সুফি সাধকের মতো৷ ধবধবে সাদা লম্বা দাড়ি৷ মোনাজাত করার সময় টপটপ করে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল৷ আমি অবাক হয়ে এই দৃশ্য দেখলাম৷
তারপর বল, কী ব্যাপার?

একজন লোক জেলখানায় আছে মামা৷ ওর সঙ্গে দেখা করা দরকার, দেখা করার কায়দা পাচ্ছি না৷ দরখাস্ত করেছি, লাভ হয়নি৷

খুনের আসামি? তিনশ বারো ধারা?

কোন ধারা তা জানি না, তবে খুনের আসামি৷

এটা কোনো ব্যাপারই না৷ টাকা খাওয়াতে হবে৷ এই দেশে এমন কোনো জিনিস নেই যা টাকায় হয় না৷

টাকা তো মামা আমার নেই৷

টাকার চিন্তা তোকে করতে বলছি নাকি? আমরা আছি কী জন্য? মরে তো যাই নাই৷ টাকা সঙ্গে নিয়ে আসছি৷ দরকার হলে জমি বেঁচে দেব৷ খুনের মামলাটা কী রকম বল শুনি৷ আসামি ছাড়ায়ে আনতে হবে৷

তুমি পারবে না মামা৷ তোমার ক্ষমতার বাইরে৷

আগে বল, তারপর বুঝব পারব কী পারব না৷ টাকা থাকলে এই দেশে খুন কোনো ব্যাপারই না৷ এক লাখ টাকা থাকলে দুটো খুন করা যায়৷ প্রতি খুনে খরচ হয় পঞ্চাশ হাজার৷ পলিটিক্যাল লোক হলে কিছু বেশি লাগে৷

আমি মোবারক হোসেন সাহেবের ব্যাপারটা বললাম৷ মামা গালে হাত দিযে গভীর আগ্রহ নিয়ে শুনলেন৷ সব শুনে দীর্ঘ নি:শ্বাস ফেলে বললেন, পুলিশের সাজানো মামলা, পেছনে আছে বড় খুঁটি৷ কিছু করা যাবে না৷ ট্রাইব্যুনাল করলে কোনো আশা নাই, সিভিল কোর্ট হলে আশা আছে৷ জজ সাহেবদের টাকা খাওয়াতে হবে৷ আগে জজ সাহেবরা টাকা খেত না৷ এখন খায়৷ অনেক জজ দেখেছি কাতলা মাছের মতো হাঁ করে থাকে৷ কেইস সিভিল কোর্টে উঠলে আমারে খবর দিয়ে নিয়ে আসবি৷

মামলা মোকদ্দমা বিষয়ে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই৷ সব সময় শুনেছি মামলা লোয়ার কোর্ট থেকে হাইকোর্টে যায়, তারপর সুপ্রিম কোর্টে৷ আমার বেলায় সরাসরি হাইকোর্ট থেকে তলব৷ শুধু আমি একা আসামি তা কিন্তু না৷ আমাকে নিয়ে বিচারকরা মামলা করেছেন এই বিষয়টি যেসব পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তারাও আসামি৷ তাতে আমার সুবিধা হলো, পত্রিকার সম্পাদকরা বড় বড় ব্যারিস্টার দিলেন৷ এই মুহূর্তে ড. কামাল হোসেন এবং ভাষাসৈনিক গাজিউল হকের নাম মনে পড়ছে৷

পত্রিকার সম্পাদকরা উপস্থিত হয়ে ক্ষমা চাইলেন এবং পার পেয়ে গেলেন৷ অ্যাটর্নি জেনারেল তার অফিসে আমাকে ডেকে নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বললেন৷ তিনি আমাকে আশ্বাস দিলেন যে, ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং বিতর্কিত বইটি বাজার থেকে উঠিয়ে নিলে আমার আর কোনো ঝামেলা হবে না৷

আমি বললাম, ভুল করলেই ক্ষমা প্রার্থনার প্রশ্ন আসে৷ আমি ভুল করিনি৷ উপন্যাসের একটি দুষ্ট চরিত্র কী বলছে তার দায়ভার লেখকের না৷ তারপরেও যদি দায়ভার আমার থাকে তাহলে আমি জজ সাহেবরা ঘুষ খান এই মন্তব্য থেকে সরে আসব না৷ সব জজ সাহেবের কথা এখানে বলা হয়নি৷ জজ সাহেবরা ভিনগ্রহ থেকে আসেননি৷ মানুষের সাধারণ ত্রুটি তাদের মধ্যেও থাকবে৷ একজন লেখক হিসেবে আমি তা লিখব৷ আমাদের সংবিধান মতপ্রকাশের অধিকার দিয়েছে৷

অ্যাটর্নি জেনারেল বললেন, আপনি কিন্তু বিপদে পড়বেন৷

আমি বললাম, কী আর করা৷ না হয় একটু বিপদে পড়লাম৷

মামলা শুরু হলো৷ আমি হাইকোর্টে যাই৷ সঙ্গে আমার তিন কন্যা এবং তাদের মা৷ তারা ভয়ে অস্থির, এই বুঝি আমাকে জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে৷ মামলার এক পর্যায়ে তিন বিচারক নিয়ে গঠিত বেঞ্চের একজন বললেন, তিনি বিব্রত৷ মামলায় থাকবেন না৷ কিছুদিন পর আরেকটি বেঞ্চ তৈরি হলো৷

সেই বেঞ্চের এক বিচারকও বললেন তিনি বিব্রত৷ পনেরো ষোল বছর তো হয়েই গেল, বিচারকরা আমার বিষয়ে বিব্রত রয়েই গেলেন৷ আমার খুব ইচ্ছা করে মামলাটা শেষ পর্যন্ত দেখতে৷ মামলায় আমি যদি জিতে যাই তাহলে প্রমাণ হবে জজ সাহেবরা সাধারণ লোভ লালসার ঊর্ধ্বে না৷ আর যদি হেরে জেলে যাই ততেও ক্ষতি নেই৷

অতীতে এই পৃথিবীতে লেখার মাধ্যমে মত প্রকাশের কারণে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে৷ আমি না হয় কিছুদিন জেলে থাকলাম৷ আমাকে জেলখানার মেঝেতে শুয়ে থাকতে হবে না৷ একুশে পদক পাওয়ার কারণে ডিভিশন দেওয়া হবে৷ বিছানায় ঘুমাব৷ ভাগ্য ভালো হলে মাথার উপর ফ্যান ঘুরবে৷ ফ্যান না ঘুরলেও ক্ষতি নেই, চোখ বন্ধ করে ময়ূরাক্ষী নদীকে জেলের ভেতর নিয়ে আসা কঠিন কোনো কাজ না৷

 

হিমুর পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ

কলকাতা থেকে দেশ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশিত হয়৷ একটা পত্রিকা কতদূর ক্ষমতাধর তা দেশ পত্রিকা না দেখলে আমি জানতাম না৷ বলা হয়ে থাকে যেকোনো অগা মগা বগা লেখককে এই পত্রিকা আসমানে তুলে দিতে পারে৷ মহান লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে৷ আবার সত্যিকারের মহান কোনো লেখককেও ধরাশায়ী করতে পারে৷ এই পত্রিকায় কারও লেখা ছাপা হওয়ার মানে (বিশেষ করে শারদীয় সংখ্যায়) লেখক হিসেবে কপালে স্থায়ী সিল পড়ে যাওয়া৷ এই সিলের কালি অলেপনীয়, ধুলেও যাবে না৷ কপালে জ্বলজ্বল করতে থাকবে৷

এক সকালে দেশ পত্রিকার এক প্রতিনিধি আমার বাসায় উপস্থিত৷ তার সঙ্গে নানা গল্প হচ্ছে৷ গল্প তিনি করছেন আমি শুনছি৷ আমি ক্লাসে যাব, দেরি হয়ে যাচ্ছে৷ ভদ্রতার খাতিরে বলতেও পারছি না৷ হাজার হলেও বিদেশি মেহমান৷ এক পর্যায়ে ভদ্রলোক বললেন, আমরা আপনার একটা উপন্যাস শারদীয় সংখ্যায় ছাপাব৷ তবে দেশে ছাপাব নাকি আনন্দবাজারে ছাপাব, নাকি সানন্দায় ছাপাব তা বলতে পারছি না৷ সাগরময়দা ঠিক করবেন৷

ভদ্রলোক হয়তো ধারণা করেছিলেন তার কথা শুনে আনন্দে আমি এমন লাফ দেব যে সিলিংয়ে মাথা ঠেকে যাবে৷ আমি তা না করে শুকনো গলায় বললাম, হুঁ৷ ভেবে দেখি৷

কী ভাববেন? পশ্চিমবঙ্গের পাঠকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কত বড় সুযোগ৷

আমি ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, ভাই আমি সুযোগ সন্ধানী মানুষ না৷ আমি লেখক৷ লেখক কখনো সুযোগের সন্ধান করে না৷ সুযোগ লেখকদের সন্ধান করে৷

তার মানে আপনি লিখবেন না?

আমি বললাম, শুধুমাত্র দেশ পত্রিকা যদি তার শারদীয় সংখ্যায় লেখা ছাপে তাহলেই পাণ্ডুলিপি পাঠাব৷ দেশ পত্রিকা ছাড়া না৷

ভদ্রলোক মোটামুটি হতভম্ব অবস্থাতেই উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, যাই৷ নমস্কার৷

আমি ধরেই নিয়েছিলাম এই বিষয়ে আর কিছু শুনব না৷ আশ্চর্যের ব্যাপার, পনেরো দিনের মাথায় দেশ পত্রিকার সম্পাদক চিঠি দিয়ে জানালেন তারা আমার একটি উপন্যাস শারদীয় দেশ পত্রিকায় ছাপাতে চান৷ হিমুকে নিয়ে লেখা একটা উপস্যাস পাঠালাম৷ ছাপা হলো৷ পরের বছর আবার চিঠি এবারও তারা একটি উপন্যাস ছাপাবেন৷ পাঠালাম আরেকটা হিমু৷

পর পর ছয় বছর কিংবা সাত বছর আমি শারদীয় দেশ পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছি৷ বেশির ভাগই হিমুবিষয়ক রচনা৷ পশ্চিমবঙ্গের পাঠকরা আমার সাহিত্য প্রতিভা (?) সম্পর্কে কোনো ধারণা পেয়েছেন কি না জানি না৷ হিমু বিষয়ে ভালোই ধারণা পেয়েছেন৷ তার প্রমাণও পেলাম৷

কলকাতায় গিয়েছি কোনো এক বইমেলায়৷ সে দেশে চেহারা দেখে আমাকে কেউ চিনবে না, কাজেই লেখকসুলভ নকল গাম্ভীর্য নিয়ে হাঁটাহাঁটি করার প্রয়োজন নেই৷ আমি মনের সুখে আড্ডা দিচ্ছি, হঠাৎ আমাকে চমকে দিয়ে একজন আমার পা ছুঁয়ে বলল, দাদা আমি হিমু৷

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ধুতি পরা হিমু দেখছি৷ পাঞ্জাবি হলুদ রঙের৷ পায়ে জুতা নেই - খালি পা৷ লক্ষণ বিচারে হিমু তো বটেই৷

আপনি কত দিন ধরে হিমু?

দুই বছরের উপর হয়েছে দাদা৷

আমি বললাম, পাঞ্জাবির কি পকেট আছে?

পকেট নেই৷

টাকা-পয়সা রাখেন কোথায়?

ভদ্রলোক পাঞ্জাবি উঠিয়ে দেখালেন, কেমারের কালো ঘুনসির সঙ্গে কাপড়ের ব্যাগ লাগানো - টাকা-পয়সা সেখানেই থাকে৷

দাদা, আমি দুজনের ভক্ত৷ আপনার এবং রামকৃষ্ণ পরমহংসের৷ আপনাদের দুজনের ছবি ঠাকুরঘরে আছে৷

আমি চমৎকৃত৷ সাত বছর দেশ পত্রিকায় লেখালেখির কারণে যদি কারও ঠাকুরঘরে ঢুকে যেতে পারি সেটা কম কী? গলায় সুর থাকলে গাইতাম অকত অধম জেনেও তো তুমি কম করে কিছু দাওনি৷

বিদেশে বেশ কিছু হিমুর দেখা পেয়েছি৷ বিদেশের হিমুরা কঠিন প্রকতির৷ একশ পার্সেন্ট খাঁটি ভেজালবিহীন হিমু৷ জার্মানির ফ্রাংকফুর্টের হিমুর কথা বলি৷ প্রচণ্ড ঠাণ্ডা৷ বরফ পড়বে পড়বে করছে, এখনো পড়া শুরু করেনি৷ এই ঠাণ্ডায় খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে একজন উপস্থিত৷ গাল ভর্তি হাসি দিয়ে বলল, স্যার আমি হিমু৷

কতদিন ধরে?

তিন বছরের বেশি হয়েছে৷ দেশেও হিমু ছিলাম৷

ছেলেটা এমনভাবে কথা বলছে যে হিমু একটা ধর্ম৷ সে ধর্ম পালন করছে৷ এর বেশি কিছু না৷ আমি হিমু ধর্ম প্রচারক৷

গত বইমেলায় এক কাণ্ড ঘটল৷ মধ্যবয়স্ক একজন ভিড় ঠেলে আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, স্যার, আমি ঠিক করেছি মার্চের তিন তারিখ থেকে হিমু হব৷ হিমু হওয়ার নিয়মকানুন কী?

আমি বললাম, মার্চের তিন তারিখ থেকে কেন?

আমার জন্মদিন মার্চের তিন৷ এখন স্যার নিয়মকানুন বলেন৷

আমি নিয়মকানুন কী বলব? ভদলোকের দিকে তাকিয়ে আছি৷ কী বলব ভেবে পাচ্ছি না৷ আমাকে উদ্ধারের জন্য অন্যপ্রকাশের কমল এগিয়ে এল৷ সে গম্ভীর গলায় বলল, নিয়মকানুন সব বইয়ে দেওয়া আছে৷ বই পড়ে জেনে নিন৷ হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হাঁটবেন৷ এইটাই প্রাথমিক বিষয়৷

প্রতি পূর্ণিমায় জোছনা দেখতে জঙ্গলে যেতে হবে?

গেলে ভালো হয়, তবে দু-একটা মিস হলেও ক্ষতি হবে না৷

 

হিমু হওয়ার নিয়মাবলি

বইমেলার ওই ঘটনার পর আমি হিমু হওয়ার নিয়মকানুন নিয়ে ভেবেছি৷ কিছু নিয়ম এখানে দিয়ে দিলাম৷ আরও কিছু মনে এলে সংশোধনী দেওয়া হবে৷

হিমু হওয়ার নিয়মাবলি :

১৷ বয়স আঠারোর উপর হতে হবে৷ আঠারোর নিচে হিমু হওয়া যাবে না৷ বিশেষ ব্যবস্থায় আঠারোর নিচেও হিমু হওয়া যাবে, তখন বাবা-মা এবং স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবের অনুমতি লাগবে৷

২৷ হলুদ পাঞ্জাবি বাধ্যতামূলক৷ শীতকালে হলুদ চাদর পরা যেতে পারে৷ বাংলাদেশের সীমানার বাইরের হিমুরা হলুদ পাঞ্জাবির বদলে হলুদ শার্ট বা জ্যাকেট পরতে পারবে৷

৩৷ খালি পা বাধ্যতামূলক না৷ কম দামি চামড়ার স্যান্ডেল পরা যেতে পারে৷ শীত প্রধান দেশের হিমুরা জুতা-মোজা পরতে পারবে৷

৪৷ প্রতি পূর্ণিমায় পূর্ণচন্দ্রের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকা বাধ্যতামূলক৷ মেঘ-বৃষ্টির কারণে চাঁদ দেখা না গেলে কল্পনায় চাঁদ দেখতে হবে৷

৫৷ বৃষ্টি বাদলার দিনে ছাতা ব্যবহার করা যাবে না৷ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে যেতে হবে৷ ঠাণ্ডা লেগে গেলে চিকিৎসা নিতে হবে৷ হিমুরা শরীর ঠিক রাখার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারে৷ এতে কোনো বাধা নেই৷

৬৷ রাতে নির্জন রাস্তায় হাঁটার বিধান শিথিলযোগ্য৷ বইপত্রে দেখা যায়, হিমুরা সন্ত্রাসী এবং পুলিশের সঙ্গে ঠাট্টা তামাশা করে৷ নব্য হিমুদের এই কাজ করতে কঠিনভাবে নিষেধ করা হচ্ছে৷ র‌্যাবের হাত থেকে শত হস্ত দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়৷

৭৷ হিমুরা কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থনকারী হতে পারবে না৷ তাদের একটাই নীতি হিমুনীতি, রাজনীতি নয়৷

৮৷ হিমুদের জন্য সপ্তাহে দুইদিন নিরামিষ আহার বাধ্যতামূলক৷ বাকি দিনগুলোতে মনের সুখে খাওয়া-দাওয়া করা যাবে৷

ঌ৷ হিমুদের পাঞ্জাবিতে পকেট থাকে না৷ তবে কেউ যদি পকেট রাখেন তবে দোষ হবে না৷

১০৷ হিমুরা কখনোই মানিব্যাগ ব্যবহার করতে পারবে না৷

১১৷ তারা সব সময় হাস্যমুখে থাকবে, সবার সঙ্গে ঠাট্টা ফাজলামি ধরনের কথা বলবে, তবে পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যদের সঙ্গে কখনো না৷ তারা ঠাট্টা ফাজলামি বুঝে না৷

১২৷ আদি হিমুর পিতা যেসব নীতিমালা হিমুর জন্য লিখে গেছেন সেইসব নীতিমালা নিয়মিত পাঠ করতে হবে৷ সেই মতো জীবনচর্যাও পরিচালিত করতে হবে৷

১৩৷ হিমুরা কখনোই কোনো তরুণীর সঙ্গে হৃদয়ঘটিত ঝামেলায় জড়াবে না৷ একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া, ফাস্টফুড খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ৷

১৪৷ এক হিমু অন্য হিমুকে আপন ভাইয়ের মতো দেখবে৷

১৫৷ বিশেষ বিশেষ উৎসবে, যেমন পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিতে সব হিমুরা একত্রিত হয়ে হিমু সঙ্গীত গাইবেন৷ হিমু সঙ্গীত এখনো লেখা হয়নি৷ সঙ্গীত লেখা এবং সুর দেওয়া হিমু গেজেটে প্রকাশ করা হবে৷


 

অসুস্থতা নাকি অন্য কিছু?

গুলশান এলাকায় মুক্তি নামের একটা ক্লিনিক আছে৷ মানসিক রোগী, ড্রাগ অ্যাডিক্ট ধরনের সমস্যার চিকিৎসা করা হয়৷ মুক্তি ক্লিনিকের একজন চিকিৎসক (ঢাকা মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগের প্রফেসর) একদিন আমাকে ক্লিনিকে ডেকে পাঠালেন৷ তার কিছু বিশেষ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় আমার সাহায্য প্রয়োজন৷

আমি অবাক হয়েই গেলাম৷ ভদ্রলোক অভিযোগের মতো করে বললেন, আপনি এসব কী করছেন? লেখার মাধ্যমে সমাজে অসুস্থতা ছড়াচ্ছেন? হিমু আবার কী?

আমি বিনীত ভঙ্গিতে হিমু কী ব্যাখ্যা করলাম৷ প্রফেসর সাহেব ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলেন না৷ গলা কঠিন করে বললেন, হিমু উপন্যাসের কোনো চরিত্র না৷ হিমু হলো একটা ব্যাধির নাম৷ তা কি আপনি জানেন?

আমি জানি না৷

হিমু ছোঁয়াচে ধরনের ব্যাধি৷ কনটেজিয়াস ডিজিজ৷ এই ডিজিজ আপনি ছড়াচ্ছেন৷ আপনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করছেন৷ অবশ্যই আপনার লেখালেখি বন্ধ করে দেওয়া দরকার৷ লেখকরা সমাজের উপকার করেন৷ আপনি করছেন অপকার৷ ইজ ইট ক্লিয়ার?

এখনো ক্লিয়ার না৷ আপনি ব্যাখ্যা করলে বুঝব৷

ডাক্তার সাহেবের কাছে জানলাম, মুক্তি ক্লিনিকে অনেক বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের চিকিৎসার জন্য পাঠান যারা হিমু নামক অদ্ভুত অসুখে ভুগছে৷ এরা লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে৷ গভীর রাতে কাউকে কিছু না বলে হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হয়৷ কয়েকদিন কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না৷ তারা মনে করে, ঐশ্বরিক কিছু ক্ষমতা তাদের হয়েছে৷ তারা যা বলবে তাই হবে৷

আমি বললাম, এই মুহূর্তে আপনার ক্লিনিকে কি কোনো হিমু আছে যার চিকিৎসা চলছে? ডাক্তার সাহেব দু:খিত গলায় বললেন, তিনজন ছেলে হিমু আছে৷ একটা আছে মেয়ে হিমু৷ মেয়ে হিমুর কী আলাদা নাম আছে?

আমি বললাম, মেয়ে হিমুর আলাদা কোনো নাম নেই৷ মেয়ে হিমুও হিমু৷ যদিও কেউ কেউ বলেন হিমি৷ আমার হিমি পছন্দ না৷

ডাক্তার সাহেব বললেন, যে তিন ছেলে হিমু আছে তার দুটা হিমু হওয়ার পরে ড্রাগ ধরেছে৷ ভয়ঙ্কর একডিলিউশনে ভুগছে৷ আসুন আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেই৷ কী প্রচণ্ড ডিলিউশনে যে এরা ভুগছে দেখে আপনারই খারাপ লাগবে৷

আমি ওদের দেখতে গেলাম৷ সত্যি মনটা খারাপ হলো৷ জীবনের আনন্দে এদের ঝলমল করা উচিত ছিল৷ তা না, স্তব্ধ হয়ে বসে আছে ক্লিনিকে৷ চোখের দৃষ্টিতে ঘোর৷ জীবন থেকে বিতাড়িত কিছু যুবক৷ আমি তাদেরকে ব্যাখ্যা করলাম যে, হিমু ফিকশন ছাড়া কিছু না৷ হিমুর চিন্তাভাবনা বা হিমুকে নিয়ে লেখকের চিন্তাভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কিছু নেই৷ যেহেতু হিমুকে নিয়ে বইগুলো আমি লিখেছি, আমি জানি৷

যুবকদের ভেতর একজন চাপা গলায় বলল, হিমুর বিষয়ে আমরা যা জানি আপনি তা জানেন না৷ আমি চমৎকৃত হয়ে বললাম, তোমরা কী জানো?

যুবক গলা আরও নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, প্রতিটা বড় শহরে একজন প্রধান হিমু থাকেন৷ তিনি শহর কন্ট্রোল করেন৷ অনেক রাতে হাঁটাহাঁটি করলে উনার দেখা পাওয়া যায়৷

উনি কী পীর টাইপ কেউ?

উনি পীরের বাবা!

যারা পীরের বাবার দেখা পেয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন৷ আমি চুপ করে গেলাম৷ একটা বিষয় আমাকে অবাক করল, হিমুর লেখককে নিয়ে তাদের নিস্পৃহতা৷ হিমুর যে জগৎ তারা তৈরি করেছে সেখানে আমার স্থান নেই৷

চিকিৎসাধীন মহিলা হিমুকে দেখতে গেলাম৷

কলেজ পড়া বাচ্চা একটা মেয়ে৷ সে কোনো এক হিমুর বইতে পড়েছে গভীর রাতে নির্জন রাস্তাগুলো সব নদী হয়ে যায়৷ হিমুরা সেই নদী দেখতে পায়৷ কাজেই এই মেয়ে রাস্তার নদী হওয়ার দৃশ্য চাক্ষুষ দেখার জন্য এয়ারপোর্ট চলে গেল৷ অনেক দূর দিয়ে বেড়া ডিঙিয়ে চলে গেল রানওয়েতে৷ গভীর রাতে রানওয়ের মাঝখানে ঘাপটি মেরে বসে রইল৷

কোনো এক বিমানের পাইলট ল্যান্ড করতে এসে এই দৃশ্য দেখে প্রায় ভিরমি খেলেন৷ জানালেন কন্ট্রোল টাওয়ারকে৷ পুলিশ এসে মেয়েটিকে গেপ্তার করল৷ মেয়ের মা উপায় না দেখে তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করলেন৷

মেয়েটি এখন সুস্থ৷ মেয়ের মা মেয়েকে নিয়ে নুহাশ পল্লীতে এসেছিলেন৷ আমি তাকে দিয়ে মিউজিক ভিডিওতে কিছু কাজও করিয়েছি৷ হিমুর এই ব্যাপারে আমি বুঝতে পারছি না৷ কেন কিছু মানুষ হিমুকে সত্যি ভাববে? এদের সাইকি কি আলাদা?

নিউইয়র্কের এক মহিলার কথা বলি৷ বাঙালি মহিলা৷ স্বামীর সঙ্গে বাস করেন৷ স্বামী ট্যাক্সি চালান৷ তিনি নিজেও ইন্ডিয়ান শাড়ির দোকানে সেলস গার্লের চাকরি করেন৷ ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা হচ্ছে৷ এক পর্যায়ে তিনি বললেন, হুমায়ূন ভাই, হিমু নিউইয়র্কে বেড়াতে এসেছে এরকম একটা উপন্যাস লিখুন৷

আমি বললাম, লেখা যেতে পারে৷

ভদ্রমহিলা বললেন, হিমুর আসা-যাওয়ার খরচ আমি দেব৷ সে আমাদের বাসায় থাকবে৷

এবার আমি চমকালাম৷ উপন্যাসের একটি চরিত্রের জন্য আসা-যাওয়ার খরচ দিতে হয় না৷ তার ঘুমুবার জন্য খাট লাগে না৷ আমি বললাম, হিমু আপনার বাড়িতে থাকবে?

তিনি লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, হ্যাঁ৷ তার সঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত কথা আছে৷ সে যে কদিন আমার সঙ্গে থাকবে আমি কাজ করব না৷ ছুটি নেব৷

আমি বললাম, আপনি একটা ব্যাপার ভুলে যাচ্ছেন হিমু বলে কেউ নেই৷ হিমু আমার কল্পনার একটি চরিত্র৷

ভদ্রমহিলা রাগত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, আপনি তাকে নিউইয়র্কে আনতে রাজি না সেটা সরাসরি বললেই হয়৷ অযুহাত দেওয়া শুরু করেছেন৷

আমি চুপ করে গেলাম৷ কিছুক্ষণের জন্য আমার মধ্যেও বিভ্রম তৈরি হলো৷ আসলেই হিমু বলে কেউ আছে না কি?

 

হিমু সড়ক

হিমুদের প্রধান কর্মকাণ্ড রাস্তায় রাস্তায় হাঁটা৷ কাজেই যুক্তিসঙ্গতভাবেই তাদের নামে একটা রাস্তার নাম হতে পারে৷ হিমু সড়ক কিংবা হিমু এভিনিউ৷ সেই সম্ভাবনা কীভাবে তৈরি হলো তার গল্প বলি৷

আমার মাথায় একবার ভূত চাপল অতি আধুনিক রেসিডেন্সিয়াল স্কুল করার৷ স্কুলটা হবে কুতুবপুরে আমার গ্রামের বাড়িতে৷ আদর্শ স্কুল - যা হবে এ দেশের রোল মডেল৷ আমি বেলাল বেগ নামের এক উদ্যোগী এবং স্বপ্নস্রষ্টা মানুষকে যাবতীয় দায়িত্ব দিলাম৷ স্কুলের জন্য জমি কিনতে শুরু করলাম৷

বেলাল বেগ ঢাকা-কুতুবপুর ছোটাছুটি করতে লাগলেন৷ মেহের আফরোজ শাওন স্কুলের ডিজাইন করতে বসল৷ আমাদের সবার মধ্যে বিপুল উৎসাহ৷ এর মধ্যে বেলাল বেগ আমাকে নিয়ে গেলেন এলজিইডি অফিসে৷ সেই অফিস প্রধান কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীও একজন কর্মযোগী মানুষ৷ তাকে বলেকয়ে স্কুলের রাস্তাটা পাকা করানো যায় কি না৷

কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী সাহেব আমাদের বসিয়ে রেখে বেশ কিছু মিটিং সারলেন৷ বসে থাকতে থাকতে আমি নিজে ক্লান্ত এবং কিছু পরিমাণে বিরক্ত৷ যতবার চলে আসতে চাই বেলাল বেগ আমার হাত চেপে ধরেন৷ নিচু গলায় বলেন, আরেকটু অপেক্ষা করুন৷ আমাদের কন্যাদায়৷

এক সময় অতি ক্লান্ত মুখে সিদ্দিকী সাহেব এলেন৷ বেলাল বেগ নানা যুক্তি দিয়ে তাকে বোঝাচ্ছেন স্কুলের জন্য পাঁচ কিলোমিটার পাকা রাস্তা যে কত জরুরি৷ সিদ্দিকী সাহেব খুব যে মন দিয়ে তার কথা শুনছেন এরকম মনে হলো না৷ এক সময় তিনি বেলাল বেগের কথার মাঝখানেই তাকে থামিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, হিমু ব্যাপারটা কী বলুন তো?

আমি গেলাম হকচকিয়ে৷ সিদ্দিকী সাহেব বললেন, আমার বড় ছেলেটা কিছুদিন হলো হিমু হয়েছে৷ হলুদ পাঞ্জাবি পরে ঘুরছে৷

আমি হেসে ফেললাম৷ হিমু ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলাম৷ সিদ্দিকী সাহেব বললেন, আপনারা খাবার না খেয়ে যেতে পারবেন না৷ বাসা থেকে টিফিন কেরিয়ারে করে আমার জন্য খাবার আসে আসুন তিনজন মিলে খাব৷ হয় যদি সুজন তেঁতুল পাতায় নয়জন৷

খাবার টেবিলে সিদ্দিকী সাহেব বললেন, এক মাসের মধ্যে যদি রাস্তাটা পাকা করে দেই তাহলে কি চলবে?

আমি হতভম্ব৷ এক মাসে রাস্তা৷ এও কি সম্ভব? ভদ্রলোক সম্ভব করলেন৷ এক মাসের আগেই রাস্তা পাকা হয়ে গেল৷ আমি ঠিক করলাম, রাস্তার নাম দেব হিমু সড়ক৷ কারণ রাস্তা পাকা করার পেছনে হিমুর সামান্য হলেও ভূমিকা আছে৷

হিমু সড়ক নাম রাখা হলো না৷ অঞ্চলের লোকজন মিটিং করে রাস্তার নাম রাখল ফয়জুর রহমান আহমেদ সড়ক৷ ফয়জুর রহমান আহমেদ আমার বাবা৷ সেই অর্থে রাস্তা হলো হিমুর দাদাজানের নামে৷ এইটাই বা খারাপ কী?

 

একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম-মৃত্যু

অধ্যাপক ইউনূস সাহেবের এক যুগ আগে বর্তমান চলমান রাজনীতিতে হতাশ হয়ে আমরা একটা রাজনৈতিক দল করেছিলাম৷ দলের নাম হিমু দল, ইংরেজিতে হিমু পার্টি৷ দলের জন্য হলুদ কাগজে প্যাড ছাপানো হলো৷ রাত জেগে গঠনতন্ত্র লেখা হলো৷ তিনটি স্তম্ভের ওপর দল৷ প্রথম স্তম্ভ সততা৷ দ্বিতীয় স্তম্ভ সততা৷ তৃতীয় স্তম্ভ সততা৷

অসৎ রাজনীতিবিদদেরও দলে আনার বিধান ছিল৷ তারা প্রথমে যাবে বায়তুল মোকাররমে৷ সেখানকার খতিব তাদের তওবা পড়াবেন৷ এরপর আসবেন শহীদ মিনারে৷ সেখানে তাদের সততার পরিমাণ অনুযায়ী কানে ধরে উঠবস করবেন৷ তারপর সোনা-রুপার পানি দিয়ে তাদের গোসল করিয়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরিয়ে দেওয়া হবে৷ দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যদি কেউ অন্যায় করেন, সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে করে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে নিঝুম দ্বীপে৷ দ্বীপে পাঠানোর আগে কপালে সিল দিয়ে দেওয়া হবে৷ সিলে বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখা থাকবে - অসৎ - Dishonest

সৎ মানুষের খোঁজে আমাদের লোকজন ঘুরে বেড়াবে৷ জীবনে কখনো কোনো অন্যায় করেননি এবং মিথ্যা কথা বলেননি - এমন লোককে বানানো হবে প্রেসিডেন্ট৷ সাংসদদের সাইকেল চালনায় পারদর্শী হতে হবে৷ কারণ তারা সাইকেলে করে অঞ্চল ঘুরে বেড়াবেন৷ সংসদ চলাকালীন সময়ে তারা শুধু ঢাকায় আসবেন, বাকি সময়টা থাকতে হবে অঞ্চলে৷ মন্ত্রীরা মন্ত্রীপাড়ায় থাকবেন না৷ তাদের জন্য লম্বা টিনের চালা করে চৌকি পেতে দেওয়া হবে৷ হোস্টেলের মতো ব্যবস্থা৷ তারা সচিবালয়ে হেঁটে যাতায়াত করবেন৷

আলাদা কিছু মন্ত্রণালয় খোলার পরিকল্পনা আমাদের ছিল, যেমন ভিক্ষুক মন্ত্রণালয়৷ এই মন্ত্রণালয় শুধু যে দেশের ভিক্ষুকদের সমস্যা দেখবে তা না৷ বিদেশ থেকে ভিক্ষা আনার ব্যাপারটাও তারা দেখবে৷ হাসি মন্ত্রণালয়৷ এই মন্ত্রণালয় দেখবে দেশের মানুষ যেন হাসতে পারে ইত্যাদি৷

হিমু পার্টি গঠনের পর সপ্তাহে একদিন পার্টির বৈঠক বসতে লাগল৷ আমরা চাঁদাবাজিও শুরু করলাম৷ পার্টির জন্য চাঁদা তোলা হতে লাগল৷ মেম্বাররা প্রতি সপ্তাহে যার যা মন চায় চাঁদা একটি কাঠের বাক্সে জমা করতে লাগলেন৷ মাসের শেষে দেখা গেল, নয় শ টাকা হয়েছে৷ এই টাকায় পার্টির কাউন্সিল মেম্বাররা একটা করে হলুদ পাঞ্জাবি এবং চাদর কিনলেন৷ দলের টাকা ব্যক্তিগত হলুদ পাঞ্জাবির পেছনে খরচ করার কারণে কাউন্সিল মেম্বাররা আজীবনের জন্য হিমু রাজনীতি থেকে বহিষ্কৃত হলেন৷ সঙ্গে সঙ্গে হিমু দলও বাতিল হয়ে গেল৷

 

হিমুর বিয়ে

আমাদের দখিন হাওয়ার ছাদে অনুষ্ঠান হচ্ছে৷ আমার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র নিষাদ হুমায়ূনের নামকরণ অনুষ্ঠান৷ হৈচৈ হচ্ছে, গান-বাজনা হচ্ছে৷ হঠাৎ আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক সমরেশ মজুমদার৷ তিনি ঢাকায় এসেছেন এটা জানি৷ কোথায় উঠেছেন জানতাম না বলেই নিমন্ত্রণ করা হয়নি৷ অনেকদিন পর তাকে দেখে ভালো লাগল৷ আমি তার হাত ধরতেই তিনি ধমকের গলায় বললেন, আপনি নাকি হিমুকে বিয়ে দিয়েছেন৷ এটা তো আপনি করতে পারেন না৷ হিমু কেন বিয়ে করবে?

আমি হিমুর বিয়ে দেইনি৷ একটা বই লিখেছি - আজ হিমুর বিয়ে৷ বইটিতে হিমু বিয়ে করে ফেলে জাতীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়৷ বইটির প্রকাশক অন্যপ্রকাশ৷ প্রায় নিয়মিতই তারা বইমেলা উপলক্ষে হিমু বিষয়ক একটা বই পায়৷ বইটির প্রকাশনা উপলক্ষে নানা আয়োজন করে৷ এইবার বিয়ের আয়োজন করে ফেলল৷ একজন পাগড়ি মাথায় বর সাজল, আরেকটি মেয়ে সাজল বউ৷ বর-কনে অন্যপ্রকাশের স্টলে বসে রইল৷ দর্শকদের আগ্রহ এবং কৌতূহল তুঙ্গ স্পর্শ করল৷ চারদিকে দারুণ উত্তেজনা৷ বইমেলায় এমন মজার দৃশ্য আগে হয়নি৷ দু-একজন অবশ্য গম্ভীর গলায় বললেন, বইমেলার শুচিতা নষ্ট হচ্ছে৷ মহান একুশের ঐতিহ্য ভুলুন্ঠিত হচ্ছে ইত্যাদি৷

হিমুর বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম না৷ টেলিভিশনে দেখেছি৷ আমার কাছে মনে হয়েছে, মেলা মানেই আনন্দ৷ মেলার পবিত্রতা রক্ষার জন্য সবাই অজু করে মেলায় আসবেন এবং ফিসফিস করে কথা বলবেন তা কেন হবে? একজন প্রকাশক যদি বুক প্রমোশনের জন্য কিছু করেন তাতেই বা দোষ কোথায়?

ফ্রাংকফুর্ট বইমেলায় দেখেছি, রান্নার বই প্রকাশনা উপলক্ষে রান্নার বিপুল আয়োজন৷ বইয়ের রেসিপি দেখে রান্না হচ্ছে৷ সবাই মহানন্দে খাচ্ছে৷ একদিকে নাচের জলসা হচ্ছে৷ একদল ছেলেমেয়ে উদ্দাম নৃত্যে মেতেছে৷ বইমেলার ভেতরই বিয়ারের দোকান খোলা৷ প্রচুর বিয়ার খাওয়া হচ্ছে৷

থাক এসব কথা, বিবাহ অনুষ্ঠানে ফিরে যাই৷ হিমু যে হয়েছে সে মৈনাক পর্বতের কাছাকাছি৷ কনে লাক্স সুন্দরী৷ যথেষ্টই রূপবতী৷ একদল হিমু গেল রেগে৷ তারা মৈনাক পর্বতকে হিমু মানতে রাজি না৷ পাল্টা মিছিল শুরু হলো - হিমুর বিয়ে, মানি না মানি না৷

অনেকদিন আগে বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা হেরে গিয়েছিল৷ আমি তখন ময়মনসিংহে অয়োময় নাটকের শুটিংয়ে ব্যস্ত৷ আর্জেন্টিনার পরাজয়ে বিশাল মিছিল বের হলো৷ স্লোগান - আর্জেন্টিনার পরাজয়, মানি না মানি না৷

তারা জানে মানি না মানি না বলে চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে ফেললেও কিছু হবে না৷ তারপরেও স্লোগান দিতে হবে৷ জাতিগতভাবে আমরা স্লোগান দিতে ভালোবাসি৷ বাকের ভাইয়ের ফাঁসি বন্ধ করার জন্য স্লোগান দিয়েছিল৷ হিমুর বিয়ে বন্ধ করার জন্যও স্লোগান৷

বেচারা হিমু কি কোনোদিনই বিয়ে করতে পারবে না? তার সুখী সুন্দর সংসার হবে না? কোনো শিশু হিমুকে বাব’ বলে ডাকবে না? এত নিষ্ঠুর কেন আমরা?

 

বালক হিমু

পাঁচ-ছয় বছর আগে আমি অতি দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম৷ একা একা থাকি দখিন হাওয়ার এক ফ্ল্যাটে৷ নিজের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন৷ মাঝে মধ্যে নুহাশ আসে৷ হোটেল থেকে খাবার এনে দুজন মিলে খাই৷ সে কিছুক্ষণ থাকে৷ দুজন নানা বিষয়ে গল্প করি৷ একদিন সে হলুদ পাঞ্জাবি পরে উপস্থিত৷ আমি বললাম, বাবা পাঞ্জাবিটা সুন্দর তো!

সে খুশি খুশি গলায় বলল, মেজপা (শীলা) নিজের হাতে বানিয়েছে৷

আমি বললাম, ভালো বানিয়েছে৷

নুহাশ বলল, বাবা এটা হিমু পাঞ্জাবি৷ আমি হিমু হয়েছি৷

আমি হিমুর পিঠে হাত রাখলাম৷ তাকিয়ে থাকলাম জানালার দিকে৷ কারণ চোখে পানি এসে যাচ্ছে৷ আমি চাচ্ছি না বালক হিমু পিতার চোখের পানি দেখুক৷

দিন পনেরো আগের কথা৷ লেখালেখি করছি৷ হঠাৎ ধুপ করে আমার কোলে কী যেন পড়ল৷ তাকিয়ে দেখি, সর্বকনিষ্ঠ পুত্র নিষাদ হুমায়ূন৷ বয়স দুই মাস৷ তার মা তাকে সাজিয়ে এনে আমার কোলে ছেড়ে দিয়েছে৷ শাওন বলল, ছেলেকে দেখে কিছু কি বোঝা যাচ্ছে?

আমি বললাম, না৷

ভালো করে তাকিয়ে দেখ৷

আমি ভালো করে দেখলাম, কপালে কাজলের ফোঁটা ছাড়া আলাদা কিছু পেলাম না৷

শাওন বলল, সে যে হিমু হয়েছে, এটা বুঝতে পারছ না? হলুদ পাঞ্জাবি, খালি পা৷

আমি বললাম, আরে তাই তো!

দুই মাসের শিশু হিমু মহানন্দে হাত-পা ছুড়ছে৷ তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে, রাস্তায় ছেড়ে দিলেই সে হাঁটতে শুরু করবে৷ একবারও পেছন ফিরে তাকাবে না৷ হিমুরা কখনো পেছনে তাকায় না৷ হিমু আইনে পেছনে ফিরে তাকানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ তারা তাকিয়ে থাকবে ভবিষ্যতের দিকে৷
 

এই গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে পড়তে অথবা ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে


   

মন্তব্যসমূহ সমূহ (00)

এই গল্পটি সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত থাকলে তা ইমেইল করে জানান