লিখেছেন - ইমদাদুল হক মিলন বিষয় - প্রথম প্রেম প্রথম বিরহ (স্মৃতি)
সংগ্রহ করা হয়েছে - প্রথম আলোর ছুটির দিনে থেকে
৭১ সালে আমার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল৷ মুক্তিযুদ্ধ চলছে৷ ওই অবস্থায় পাকিস্তান সরকার একটা পরীক্ষা নিল৷ সেই পরীক্ষা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না৷ বিক্রমপুরে গিয়ে পরীক্ষার সময়টা পার করে এলাম৷ থাকি পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া৷ আমার সৌভাগ্য, গেন্ডারিয়া ও বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডল প্রভৃতি গ্রাম বেশ নিরাপদ ছিল৷ পাকিস্তান আর্মি ও রাজাকারদের তেমন উত্পাত ছিল না৷
আমার বন্ধুদের মধ্যে একজনও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেনি৷ সবাই আমার মতো ছোটখাটো, রোগাপটকা৷ থ্রি নট থ্রি রাইফেল শক্ত করে ধরার শক্তি নেই৷ তবে ভেতরে ভেতরে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করেছে৷ আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলী এক দিন এক রাত তার এক মুক্তিযোদ্ধা মামাকে আমাদের বাসায় লুকিয়ে রেখেছিল৷ আমি আর আমার বড় ভাই যে ছোট্ট রুমটায় থাকতাম, সেখানেই সেই মামা আর মোহাম্মদ আলীসহ গাদাগাদি করে শুয়েছিলাম৷ আব্বা ছোট চাকরি করেন৷ আমরা ১০টা ভাই-বোন৷ সংসারে অনটন লেগেই আছে৷ এ অবস্থায় সংসারে অতিরিক্ত লোক যোগ হলে অসুবিধাই হয়৷ তবু মোহাম্মদ আলীর মুক্তিযোদ্ধা মামাকে যতটা সম্ভব ভালো খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিলেন আমার মা৷
আব্বা মারা গেলেন অক্টোবরে৷ মুক্তিযুদ্ধ তখন তুঙ্গে৷ দেশ স্বাধীন হয় হয়৷ কিন্তু আব্বার মৃত্যু আমাদের ফেলে দিল অকূল সায়রে৷ একদিকে দেশে চলছে স্বাধীনতার যুদ্ধ, অন্যদিকে আমাদের সংসারে চলছে দুই বেলা খেয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ৷ কী করি? আমি আর আমার বড় ভাই বেশ কয়েকটা টিউশনি জোগাড় করলাম৷ পরিচিতজনেরাই জোগাড় করে দিল৷ টু থ্রির ছাত্রছাত্রী থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াতে লাগলাম৷ ১০ টাকা ২০ টাকা বেতন পাই৷ পরিচিত সার্কেলে ভালো ছাত্র হিসেবে কিছুটা সুনাম ছিল৷ এ কারণে দেশের ও রকম অবস্থায়ও টিউশনি পেতে অসুবিধা হয়নি৷ সকাল-দুপুর-বিকেল যে বাড়িতে যখন সময় দেয়, তখনই গিয়ে পড়িয়ে আসি৷
টিউশনি করা আর লজিংমাস্টারদের জীবনের অতি স্বাভাবিক ঘটনা ছাত্রীর প্রেমে পড়া৷ আমিও আমার এক ছাত্রীর প্রেমে পড়ে গেলাম৷ মেয়েটি সত্যি সুন্দর৷ তখন সে বোধ হয় ক্লাস নাইনে পড়ে৷ যুদ্ধের কারণে স্কুল-কলেজ বেশির ভাগই বন্ধ৷ যেগুলো খোলা আছে সেগুলোতেও ছাত্রছাত্রীরা তেমন যায় না৷ ওই মেয়েও যাচ্ছিল না৷ সুতরাং তার মা-বাবা চাইলেন বাড়িতেই পড়ুক মেয়ে৷ অল্প দামে যদি একজন টিচার পাওয়া যায়৷
২০ টাকা বেতনে ঠিক করা হলো আমাকে৷ প্রতিদিন দুপুরের পর এক-দেড় ঘণ্টা আমি তাকে অঙ্ক করাব, ইংরেজি-বাংলা পড়াব৷ প্রথম দিন পড়াতে গিয়েই দেখি মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে তো তাকিয়েই থাকে৷ চোখ আর সরায় না৷ এত স্নিগ্ধ, পবিত্র চোখ! তার চোখের দিকে তাকালেই আমার বুকের ভেতর কেমন একটা ভাঙচুর হয়৷ কেমন লজ্জা লাগে৷ আমি তাকে পড়াতে ভুলে যাই, সে কী পড়ছে ভুলে যায়৷ ওটুকুই৷ মুখে কোনো কথা আমাদের হয় না৷ মানে পড়া-লেখার বাইরে কোনো কথা হয় না৷
একদিন পড়াতে গিয়ে শুনলাম, তার খুব জ্বর৷ আজ পড়তে পারবে না৷ কথাটা বলে গেল তার ছোট বোন৷ ওই বাড়িতে গেলেই এক কাপ চা আর বিস্কুট দেওয়া হতো আমাকে৷ সেদিনও যথারীতি দিয়েছে৷ তারা থাকত তিন তলায়৷ তিন তলার অর্ধেকটায় তাদের ফ্ল্যাট, অর্ধেকটায় খোলা ছাদ৷ ছাদের একপাশে সিঁড়ি৷ চা-বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে আসছি, দেখি সিঁড়ির সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে৷ জ্বরে বিষন্ন হয়ে গেছে মিষ্টি মুখখানি৷ তবু তাকে দেখেই বুকের ভেতর সেই গোপন ভাঙচুর৷ কোনোরকমে বললাম, এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? তোমার জ্বর৷ ঘরে যাও৷
সে কোনো কথা বলল না৷ সিঁড়ির রেলিংয়ে ভর দিয়ে এমনভাবে দাঁড়াল, ইচ্ছে করলেই আমি তার হাতটা ছুঁয়ে দিতে পারি৷ তার চোখে তখনো সেই অপলক দৃষ্টি৷ খুব ইচ্ছে করছিল তার হাতটা একটু ছুঁয়ে দিই৷ একটুক্ষণ ধরে রাখি ওই স্বপ্নমাখা হাত৷ সাহস হয়নি৷ যদি সে রেগে যায়? যদি বাড়িতে বলে দেয় আমি তার হাত ধরেছি!
সেই মেয়ে আমার প্রথম প্রেম৷ কিন্তু মুখ ফুটে আমরা দুজন দুজনকে কখনো বলতে পারিনি মনের কথা৷ রবীন্দ্রনাথের গানের মতো ‘মনে রয়ে গেল মনের কথা৷’ তার জন্য শুধুই আকুলতা তখন৷ যখন-তখন মনে পড়ে তার কথা৷ একদিন তার মুখটি না দেখলে রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না৷ ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস পড়ে৷ শুধু মনে হয়, কখন কাটবে সময়, কখন তার সঙ্গে দেখা হবে! দেখা হওয়ার মুহূর্তে তার চোখের তারা যেভাবে কেঁপে ওঠে, মুখ হয় সদ্যফোটা ফুলের মতো উজ্জ্বল, ঠোঁটে ফুটে ওঠে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম হাসি, ওই দেখে বুঝতে পারি আমার মতোই অবস্থা তার৷ শুধু মুখে বলা হয় না মনের কথাটি৷
মুক্তিযুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে৷ ঢাকার আকাশে ককফাইট করছে ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান৷ শেষবারের মতো ঢাকা ছাড়ছে সবাই৷ এ অবস্থায় তারা চলে গেল তাদের গ্রামের বাড়িতে, আমি চলে গেলাম বিক্রমপুরে৷ শুরু হলো আমাদের বিরহের কাল৷ তার তখনকার মনের অবস্থা আমার জানা নেই, আমি শুধু জানি আমারটা৷ তার কথা ভেবে সেইসব দিনে বিষন্ন থেকে বিষন্নতর হয়েছি আমি৷ কাউকে বলতে পারিনি সে কথা৷ মনের গভীরে ছবির মতো বাঁধিয়ে রেখেছি তার মুখখানি৷ কে জানে, এ জীবনে তার সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে কি না! যুদ্ধে আমরা কে বাঁচব কে মরে যাব, কে জানে৷
দেশ স্বাধীন হলো৷ স্বাধীনতার বেশ কয়েক দিন পর তারা ফিরে এল৷ আবার আমাদের দেখা হলো৷ দেখা হওয়ার মুহূর্তে দুজন দুজনার চোখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম৷ চোখের ভাষায় দুজনেরই বলা হয়ে গেল, ‘কেটেছে একেলা বিরহের বেলা৷’
প্রিয় পাঠক, তারপর জীবন আমাদের বহুদূর সরিয়ে নিয়েছে৷ আমরা দুজন হয়ে গেছি দুই ভুবনের মানুষ৷ ৯৩ সালের বইমেলায় ঠিক ১৯ বছর পর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল৷ কথায় কথায় সে আমাকে বলল, সিঁড়ির পাশে সেদিন সে তার হাতটি আমার জন্যই রেখেছিল৷ যদি সেদিন তার হাত আমি ধরতাম, তাহলে সেও ধরত আমার হাত৷ এ জীবনে আমার হাতটি সে কখনো ছেড়ে দিত না৷