সে ভালোবাসে, নাকি বাসে না

লিখেছেন - ইমদাদুল হক মিলন    বিষয় - প্রেমের গল্প

সংগ্রহ করা হয়েছে - প্রথম আলো থেকে

   

রেস্টুরেন্টে ঢুকে মম বলল, উহ মাগো, ঘুরতে ঘুরতে টায়ার্ড হয়ে গেছি৷

রবি বলল, টায়ার্ড হওয়ার কথা আমার৷ আমি ড্রাইভ করেছি৷ তুই তো শুধু বসে থেকেছিস৷

কোথায় বসে থাকলাম? তোর বকবকানি শুনেছি না৷ এত কথা শুনলে কেউ টায়ার্ড না হয়ে পারে! এখন মনের মতো থাই ফুড খেয়ে টায়ার্ডনেস কাটাব৷ রবি, নো বকবক৷

কিন্তু আমার সমস্যা তো মিটছে না৷

কী সমস্যা সেটাই তো বলছিস না৷ শুধু ঘুরে বেড়ালি৷ এ কথা, সে কথা৷ আমি এতবার জানতে চাইলাম, তাও বললি না৷ এখন বল৷

দাঁড়া, খেতে খেতে বলি৷

রবি ওয়েটারকে ডাকল৷ কিউজ মি!

মম বিরক্ত হলো৷ কিউজ মি আবার কী? এক্সকিউজ মি৷

পুরোটা বলতে টায়ার্ড লাগছে৷ এ জন্য সংক্ষেপ৷

ওয়েটার সামনে এসে দাঁড়াল৷ রবি মমর দিকে তাকাল৷ তাকিয়ে আর চোখ সরায় না৷

মম বলল, কী হলো?

তোকে যা লাগছে না! নীল শাড়ি, এত সুন্দর মেকাপ! একদম ঐশ্বরিয়া, একদম৷

রবির কথা পাত্তা দিল না মম, ওয়েটার দাঁড়িয়ে আছে৷ অর্ডার দে৷

আমি এসব পারি না৷ তুই দে৷

কী খাবি?

শোন বাবা, তোর জন্মদিন, যা ইচ্ছা অর্ডার দে৷ নো প্রবলেম৷

টাকা-পয়সা আছে, নাকি খাওয়ার পর আমাকে পে করতে হবে?

আমার কাছে না থাকলে তুই করবি! তোর টাকা আর আমার টাকা একই৷ অর্ডার দে, আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি৷

ওদের কথাবার্তা শুনে ওয়েটার মুচকি মুচকি হাসছিল৷ রবি উঠে যেতেই সিরিয়াস মুখ করে মমর দিকে তাকাল, ইয়েস, ম্যাডাম৷

মম মেনু ঘাঁটতে ঘাঁটতে কয়েকটা আইটেমের কথা বলল৷

খাবার দেখে খুশিই হলো রবি৷ মজার মুখভঙ্গি করল৷ অর্ডার তো ভালোই দিয়েছিস৷ তার মানে বন্ধুর পকেটটা আজ খালি করবি৷

মম তার অসাধারণ সুন্দর চোখ তুলে রবির দিকে তাকাল, রবি, আজ আমার জন্মদিন৷

সেটা ঠিক আছে৷ কিন্তু তোকে না বলেছি, এ রকম চোখ করে আমার দিকে তাকাবি না৷ আমার অসুবিধা হয়৷

কী অসুবিধা?

বলব না৷ খা বাবা, খা৷ আমিই পে করব৷

রবির প্লেটে খাবার তুলে দিল মম৷ নিজে নিল৷ খেতে খেতে বলল, কিন্তু সমস্যাটা বলছিস না কেন?

এখন বলতেই হবে৷ এখন আর না বলে উপায় নেই৷ ইয়ে মানে, মম, আমি ডট ডট পড়েছি আর কী!

ডট ডট পড়েছিস মানে? ডট ডট পড়া অর্থ কী?

বুঝিসনি?

না৷

তোর সমস্যা হচ্ছে তোকে সবকিছু একেবারে পানির মতো পরিষ্কার করে বলতে হয়৷ ডট ডট মানেটা হচ্ছে ইয়ে আর কি৷ ইয়ে ...

ইয়ে মানে কী?

ইয়েও বুঝিস না? আরে ইয়ে মানে হচ্ছে ওই ইয়ে আর কি৷ প্রেম, প্রেম৷ আই অ্যাম ইন লাভ৷

মম খুবই খুশি হলো৷ সুন্দর চোখ আরও সুন্দর হলো তার৷ মিষ্টি মুখখানি উদ্ভাসিত হয়ে গেল৷ সত্যি?

সত্যি৷

হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে ডান হাত বাড়িয়ে দিল মম৷ কনগ্রাচুলেশন্স৷

রবিও হাত বাড়াল৷ মমর হাত ধরে বলল, থ্যাংকস৷

কিন্তু মেয়েটা কে? কোথায় থাকে? তোর সঙ্গে পরিচয় হলো কবে? আমাকে তো কিছুই বলিসনি?

বলি বলি করেও বলা হচ্ছিল না৷

একটা একটা করে বল৷ নাম কী?

ইয়ে, নাম হচ্ছে অন্তরা৷ অন্তরা৷ কয়েক দিন আগে পরিচয় হয়েছে৷

দেখতে কেমন?

অসাধারণ সুন্দর৷ রিয়েলি অসাধারণ৷ রানী মুখার্জি টাইপ৷ সিডি কিনতে গিয়েছিলাম রাইফেলস স্কয়ারে৷ ওখানে পরিচয়৷

তোকে পছন্দ করেছে? নাকি ওয়ান সাইডেড?

আরে না, আমাকে খুবই পছন্দ করেছে৷ ফোনে রোজ তিন-চারবার করে কথা হচ্ছে৷

মম খুবই খুশি, রিয়েলি?

রিয়েলি৷

আমার খুবই মজা লাগছে৷ এত দিনে তোর একটা গতি হলো৷

কিন্তু সমস্যাটা তো শুনছিস না?

এরপর আর কী সমস্যা?

আমি এখনো তাকে কিছুই বলতে পারিনি৷

মানে?

মানে প্রপোজ করা হয়নি৷ কীভাবে বলব, আমি তোমাকে ভালোবাসি বা ইত্যাদি ইত্যাদি৷ এসব কীভাবে বলতে হয় জানি না তো! তুই আমাকে হেল্প কর৷

আমি কী হেল্প করব?

শিখিয়ে দে, কীভাবে প্রপোজ করতে হয়৷

তুই একটা সম্পূর্ণ গাধা৷ এসব কাউকে শিখিয়ে দিতে হয়? হিন্দি সিনেমায়, আমাদের টিভি নাটকে দেখিস না কীভাবে নায়কেরা প্রপোজ করে?

হিন্দি সিনেমা আমি দেখি না৷ কোন কোন সিনেমা দেখা যায় বলে দে৷ আজই দেখে ফেলি৷ মানে দেখতে শুরু করি৷

থাক, এত পরিশ্রমের দরকার নেই৷ আমিই শিখিয়ে দিচ্ছি৷

না না, শুধু শেখালে হবে না৷ পুরোপুরি একটা রিহার্সেল করাতে হবে৷ খাওয়া শেষ করে আমাদের ফ্ল্যাটে চল৷ মা আর বাবা দশ দিনের জন্য গেছে গ্রামের বাড়িতে৷ বুয়া দুটোকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে৷ ফ্ল্যাটে আমি একদম একা৷ ওখানে গিয়ে রিহার্সেল করি৷ কারণ আজই তাকে আমি প্রপোজ করতে চাই৷ আজ বিকেলেই সে আমাদের ফ্ল্যাটে আসবে৷

আচ্ছা, ঠিক আছে৷ এখন খা৷ গাধা কোথাকার! একটা মেয়েকে কীভাবে প্রপোজ করতে হয় তাও জানে না৷

 

বাড়িতে ঢুকে গাড়ি পার্ক করে রবি বলল, একটু দাঁড়া, মম৷ আমি দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলে আসি৷

দারোয়ানের সঙ্গে আবার কী কথা?

বললাম না ঝুমু আজ বিকেলে আমাদের ফ্ল্যাটে আসবে৷ আসলে যেন আমাকে ইন্টারকম করে৷

মম অবাক, ঝুমু আবার কে?

ওই যে ওই মেয়েটা৷

তুই না ওর নাম বললি অন্তরা?

রবি সরল মুখ করে হাসল৷ ভালো নাম অন্তরা৷ ডাকনাম হচ্ছে ঝুমু৷

ও৷ আসার আগে তোকে ফোন করবে না?

তা তো করবেই৷

তাহলে দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলার কী আছে?

তবু একটু বলে আসি৷ তুই দাঁড়া৷ এক মিনিট৷

এক-দেড় মিনিটের মধ্যেই ফিরল রবি৷ মমকে নিয়ে তাদের ফ্ল্যাটে এল৷ ফ্ল্যাটে ঢুকে মম কোনো কথা বলল না৷ কিচেনে ঢুকে দু মগ কফি করল৷ দু হাতে মগ দুটো ধরে ড্রয়িং রুমে এল৷ একটা মগ রবির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, আয় কফি খেতে খেতে তোকে সব শেখাই৷ নে, ধর৷

রবি কফির মগ নিল৷ চুমুক দেওয়ার আগেই বলল, তাড়াতাড়ি কর, তাড়াতাড়ি৷ ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কিন্তু এসে পড়বে৷

রবির মুখোমুখি বসে কফিতে চুমুক দিল মম৷ কিন্তু নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে প্রপোজ করাটা কি ভালো দেখাবে?

রবি এক চুমুক কফি খেল৷ এটা আমিও ভেবেছি৷ কিন্তু ও আসতে চাইছে, না করি কী করে৷ যা ইচ্ছা হোক গিয়ে৷ আমি আর দেরি করতে পারছি না৷ আজই যা বলার বলে ফেলব৷ তুই আমাকে শিখিয়ে দে৷

কথাগুলো বলতে হবে খুব সুন্দর করে, বুঝলি?

আচ্ছা, ঠিক আছে৷ সুন্দর করেই বলব৷

গলার আওয়াজ থাকবে স্নিগ্ধ৷

স্নিগ্ধ আওয়াজটা কী রকম?

নরম ধরনের আর কি! আর মুখটা সব সময় হাসি-হাসি৷

তুই একটু দেখিয়ে দে৷

ঠিক আছে৷ দাঁড়া৷

কফির মগ রেখে উঠে দাঁড়াল রবি৷ মমও তার মগ রাখল৷ অভিনয় করে দেখাতে লাগল রবি কীভাবে অন্তরাকে প্রপোজ করবে৷ বলল, অন্তরা তোর ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে৷ কলিং বেল বাজাল৷ তুই দরজা খুলেই বললি, আজকের আগে এত সুন্দর করে কেউ আমাদের কলিং বেল বাজায়নি৷ তোমার আঙ্গুলের ছোঁয়ায় কলিং বেলের আওয়াজও মিষ্টি হয়ে গেছে৷ কিন্তু গলার স্বর অতি নরম, অতি স্নিগ্ধ৷ মুখটা হাসি-হাসি৷

বুঝলাম৷ তারপর?

বলবি, ফ্ল্যাটে কেউ নেই৷ শুধু আমরা দুজন৷ তুমি কি আমার রুমে গিয়ে বসবে, নাকি ড্রয়িং রুমে? আই মিন, তুমি যেখানে কমফোর্ট ফিল কর৷

আরে, এসব কায়দা আমি জানি৷ এসব শেখাতে হবে না৷ আসল কথা বল৷ প্রেমের কথাটা বলব কী করে?

সেই দিকেই তো যাচ্ছি৷ ওকে কোথাও বসিয়ে, না না বসাবার দরকার নেই, আগে থেকেই জিনিসটা তোর হাতে রাখবি৷

কোন জিনিস?

ফুল, ফুল৷ একটা টকটকে লাল গোলাপ হাতে ধরে রাখবি৷ কিন্তু সেই হাতটা রাখবি পেছনে৷ আচমকা ফুলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলবি, আমার হৃদয় তোমাকে দিলাম৷

এতেই হয়ে যাবে?

হ্যাঁ৷ কিন্তু সঙ্গে আর একটা কাজও করতে হবে৷ অপলক চোখে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে৷

রবির মুখে করুণ একটা ভঙ্গি ফুটে উঠল৷ এই একটা সমস্যা হয়ে গেল৷ আমি অপলক চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারি না৷ চোখে পলক পড়ে যায়৷

মম রেগে গেল৷ এ জন্যই বলি তুই একটা সম্পূর্ণ গাধা৷ আয়, একবার প্র্যাকটিস কর৷ ওই ওখান থেকে একটা ফুল নিয়ে আয়৷

ওগুলো তো তোর জন্মদিনের জন্য কিনে রেখেছি৷ তাড়াহুড়ো করে চায়নিজ খেতে চলে গেলাম, এ জন্য নেওয়া হয়নি৷ তোকে দেওয়াও হয়নি৷

কোনো অসুবিধা নেই৷ ওখান থেকে একটা গোলাপ নে৷ অন্যগুলো বাড়ি যাওয়ার সময় আমি নিয়ে যাব৷

আচ্ছা, ঠিক আছে৷

রবি একটা লাল গোলাপ নিল৷

মম বলল, হাতটা পেছনে লুকা৷

ফুল ধরা হাত পেছনে লুকাল রবি৷

এবার আমার চোখের দিকে তাকা৷

রবি তাকাল৷

এবার বল৷

মমর চোখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে ফুল ধরা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিল রবি৷ সুন্দর উচ্চারণে বলল, আমার হৃদয় তোমাকে দিলাম৷

মমর বুকের ভেতর কোথায় যেন কী রকম একটা কাঁপন লাগল এ কথায়৷ শরীর কী রকম কাঁটা দিল৷ চোখ বদলে গেল মমর, মুখ বদলে গেল৷ নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে রবির গোলাপ সে নিল৷ রবির মতো করেই তার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই যেন বলে ফেলল, আমার হৃদয়ও আজ আমি তোমাকে দিলাম৷

মমর কথা বলার ভঙ্গি, তাকিয়ে থাকা, চোখ ও মুখের পরিবর্তন খেয়াল করল রবি৷ সে একটু থতমত খেল৷ অন্তরা কি তোর মতো করে বলবে?

মম যেন অন্য এক জগত্‍ থেকে ফিরল৷ একটু যেন বিব্রত সে৷ বলল, তা আমি কী করে বলব? তবে অন্তরার জায়গায় আমি হলে এভাবেই বলতাম৷

এ সময় রবির মোবাইল বাজল৷ রবি ব্যস্ত ভঙ্গিতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ধরল, হ্যালো৷

তার পরই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল তার৷ ও তুমি? এসে পড়েছ? কোথায়? আরে তাই নাকি? দারোয়ানকে বলা আছে৷ চলে এসো, চলে এসো৷

মোবাইল অফ করে হাসিমুখে মমর দিকে তাকাল রবি৷ অন্তরা এসে পড়েছে৷

মম চিন্তিত হলো৷ এত তাড়াতাড়ি এসে পড়ল? কিন্তু আমাকে নিয়ে তো একটা ঝামেলা হয়ে যাবে৷

কী ঝামেলা?

মেয়েরা খুব ঈর্ষাকাতর হয়৷ তোর একা ফ্ল্যাটে এভাবে আমাকে দেখলে অন্তরা ভুল বুঝতে পারে৷ তোদের প্রেম আজই শেষ হয়ে যেতে পারে৷

এটা তো আমি ভাবিনি! এখন তাহলে কী হবে?

গেস্টরুম দেখিয়ে মম বলল, আমি ওই রুম ভেতর থেকে বন্ধ করে বসে থাকি৷ অন্তরা চলে যাওয়ার পর বেরোব৷

ঠিক আছে, ঠিক আছে৷ তুই ওই রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ কর, আর আমি দরজা খুলে অন্তরার জন্য দাঁড়িয়ে থাকি৷

ঠিক আছে৷ তবে আমি যেভাবে বলেছি ঠিক ওভাবে সব করবি৷ ওকে?

ওকে, ওকে৷

দৌড়ে গেস্টরুমে ঢুকল মম৷ ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল৷ সে যেভাবে যা শিখিয়ে দিয়েছে রবি ঠিক সেভাবে সব কথা বলতে পারে কি না জানার আগ্রহ৷

রবির উত্সাহী গলা শোনা গেল মিনিটখানেক পর৷ আরে, এসো এসো৷ আমি তোমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছি৷

তারপর দরজা বন্ধ করার শব্দ পেল মম৷ নিশ্চয় অন্তরা ভেতরে ঢুকেছে, রবি দরজা বন্ধ করেছে৷

আবার রবির গলা শোনা গেল৷ শোনো অন্তরা, দরজা খুলে রাখা কথাটার অন্য একটা অর্থও আছে৷

অন্তরা বলল, কী অর্থ?

আমি তোমার জন্য আমার হৃদয়ের দরজাও খুলে রেখেছি৷

অন্তরা মুগ্ধ হলো, তুমি এত সুন্দর করে কথা বলো, শুনলে বুকের ভেতরটা কেমন তোলপাড় করে৷ হৃদয়ে দোলা লাগে৷

হৃদয় শব্দটা শুনলেই হৃদয়ে দোলা লাগে, ঠিক না?

বন্ধঘরের ভেতর মমর চেহারা তখন বদলাতে শুরু করেছে৷ একেবারেই অন্য রকমের একটা অনুভূতি তার হচ্ছে৷ অন্তরা মেয়েটার কথা যেন সে সহ্য করতে পারছে না৷ কী রকম একটা রাগ, কী রকম একটা জেদ, নাকি অচেনা এক ঈর্ষাবোধ নিজের ভেতর জেগে উঠতে দেখছে মম৷ অস্থির লাগছে তার, খুবই অস্থির এবং দিশেহারা লাগছে৷

কেন, এমন হচ্ছে কেন মমর?

বাইরে তখন আবার শোনা গেল রবির গলা৷ একটু যেন জোরে কথা বলছে রবি৷ আমার নাম রবিন৷ কিন্তু এখন আর কেউ রবিন ডাকে না৷ রবি বলে ডাকে সবাই৷

অন্তরা বলল, রবিই সুন্দর৷ রবির কিরণ৷ অর্থাত্‍ তোমার কিরণে আমার জীবন উজ্জ্বল হয়ে যাবে৷

মম মনে মনে বলল, ইস, রবির কিরণ! জীবন উজ্জ্বল হয়ে যাবে! কোথাকার কে হঠাত্‍ করে এসে জীবন উজ্জ্বল করছে৷ কী তোর জীবন রে!

রবি বলল, এই গোলাপ তোমাকে দিলাম৷ এ কোনো গোলাপ নয়, এ আমার হৃদয়৷ আমার হৃদয় আমি তোমাকে দিলাম৷ তুমি গ্রহণ করো৷ আমার হৃদয় তুমি গ্রহণ করো৷ আর তোমার হৃদয় দাও আমাকে৷

এবার আর সহ্য করতে পারল না মম৷ কোনো কিছুই মাথায় রইল না তার৷ পাগলের মতো দরজা খুলে ছুটে বেরোল সে৷ না, রবি, না৷ আমার ফুল তুই অন্য কাউকে দিতে পারবি না৷ না৷ না৷

রবি হো হো করে হেসে উঠল৷

রবির হাসি পাত্তা দিল না মমৱ৷ এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, কোথায়? সে কোথায়?

সে মানে? অন্তরা?

হ্যাঁ৷ কোথায় গেল?

কোথাও যায়নি৷ কোথাও থেকে আসেওনি৷ সে আছে আমার অন্তরে৷

কী বলছিস তুই? আমি পরিষ্কার তার গলা পেলাম৷ তোর সঙ্গে এতক্ষণ ধরে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলল৷

সেই মিষ্টি গলার কথাটা তুই শুনবি?

কিছুক্ষণ আগে অন্তরা যে ভঙ্গিতে, যে সুরে কথা বলেছে, অবিকল সেই ভঙ্গি, সেই সুরে রবি বলল, আমিই অন্তরা৷ রবির অন্তরে বাস করি৷

অন্য সময় হলে রবির এই মেয়েলি স্বর আর ঢং দেখে হেসে মরে যেত মম৷ এখন উল্টো অবস্থা হলো তার৷ কেমন কান্না পেল৷ কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, ও, তাহলে এসব তোর চালাকি! রবি, রবি, আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না৷ আমার এমন লাগছিল কেন? এখনই বা এমন লাগছে কেন? আমিই তোকে সব শিখিয়ে দিয়েছি, তারপর তুই যখন ওসব কথা বলছিলি, আমার মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল, আমার সম্পদ যেন কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷ আমি সহ্য করতে পারছিলাম না৷ কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না৷ আমার এমন হচ্ছিল কেন, রবি?

রবি গম্ভীর গলায় বলল, এটাই আমি চেয়েছি৷ মম, অন্তরা বা ঝুমু বলে কাউকে আমি চিনি না৷

সত্যি?

সত্যি৷ আমি চিনি তোকে৷ আমি চাই তোকে৷ আর কাউকে না, কাউকে না৷

মমর চোখে-মুখে তখন আশ্চর্য এক ঘোর লেগেছে৷ কণ্ঠে লেগেছে অচেনা এক মাদকতা৷ রবির মতো করেই সে বলল, আমিও, আমিও তোকে চাই৷ শুধু তোকে, শুধু তোকে৷ তোকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারি না৷ কাউকে না৷

কিন্তু এত দিন আমরা কেউ কাউকে বলিনি কেন?

কী জানি৷ আজকের আগে এই অনুভূতিই আমার হয়নি৷

সত্যিকার প্রেম কখনো কখনো এইভাবে চাপা পড়ে থাকে৷ তাকে তুলে আনতে হয়৷ আমি এই তোলার কাজটা আজ করেছি৷

এত দিন করিসনি কেন? আরও আগে করিসনি কেন?

অনেক আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছি, তোর জন্নদিনে এভাবে তোকে আমি জাগিয়ে তুলব৷

কিন্তু অন্তরা যে ফোন করল?

অন্তরা না, ওটা আমাদের দারোয়ান৷

কী?

হ্যাঁ৷ দারোয়ানকে বলেছিলাম, সে যেন আমার মোবাইলে একটা ফোন করে৷ একদম সাজানো নাটক৷ ওই যে তোকে দাঁড়াতে বলে আমি দারোয়ানের কাছে গেলাম না!

মম কাতর, অসহায় গলায় বলল, এখন কী হবে, রবি?

কী হবে মানে? আজ থেকে আমাদের নতুন পরিচয়৷ প্রেমিক-প্রেমিকা৷ কদিন পর আমি হচ্ছি বর, তুই হচ্ছিস কনে৷ বছর দেড়েক পর তুই হচ্ছিস মা, আমি হচ্ছি বাবা৷

রবিকে আলতো করে একটা ধাক্কা দিল মম৷ যাহ্৷

একটু থেমে বলল, এই, আমার কেমন যেন লজ্জা লাগছে৷ রবি, আমি তোর দিকে তাকাতে পারছি না৷ একদম তাকাতে পারছি না৷

রবি দুহাতে মমর মুখটা তুলে ধরল৷ আমিও পারছি না৷ তবু জোর করে তাকাচ্ছি৷ শোন, আজ সকালে তোর জন্য ফুল কিনতে গিয়ে একটা ফুলের পাপড়ি ছিঁড়েছি আর বলেছি, সে ভালোবাসে, নাকি বাসে না! প্রথমে একবার ইংরেজিতে বলেছি, শি লাভস মি, শি লাভস মি নট৷ ইংরেজিটা বলতে ভাল্লাগছিল না৷ বাংলায় বলতে গিয়ে দেখি, বাহ্, বেশ জমে গেল৷ ‘সে ভালোবাসে’ কথাটায় এসে পাপড়ি শেষ হলো৷ তখন থেকেই জানি তুইও আমাকে ভালোবাসিস৷ তোর মুখ থেকে কথাটা শোনার জন্য এত কিছু৷ নারী চরিত্রে অভিনয়ও করতে হলো৷

দুহাতে রবির গলা জড়িয়ে ধরে মম বলল, ভালোবাসা প্রমাণের জন্য ফুলের পাপড়ি ছেঁড়াছেঁড়ি করে তো মেয়েরা৷

মমর গ্রীবার কাছে মুখ রেখে রবি বলল, ছেলেরাও করে৷


এই গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে পড়তে অথবা ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে


   

মন্তব্যসমূহ (00)

এই গল্পটি সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত থাকলে তা ইমেইল করে জানান