মুহম্মদ জাফর ইকবালের ছয়টি মজার ঘটনা

লিখেছেন - মুহম্মদ জাফর ইকবাল    বিষয় - আত্মজীবনীমূলক

সংগ্রহ করা হয়েছে - প্রথম আলোর আলপিন থেকে

   

ছেলেবেলার একটা মজার ঘটনা, আমেরিকার একটা মজার ঘটনা, স্কুলজীবনের একটা মজার ঘটনা, দাম্পত্য জীবনের একটা মজার ঘটনা, লেখালেখি নিয়ে একটা মজার ঘটনা, সন্তান-স্ত্রীকে নিয়ে একটা মজার ঘটনা
 

ছেলেবেলার একটা মজার ঘটনা

মনে হচ্ছে এটা আগে কখনো বলে ফেলেছি৷ তবুও আবার বলি৷ আমরা তখন কুমিল্লা থাকি - এক একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঠিক করা হলো প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনারে গিয়ে ফুল দেওয়া হবে৷ সমস্যা হচ্ছে এত ভোরে কেউ ঘুম থেকে উঠতে পারবে না৷ তাই পাশের বাড়ির কয়েকজন বাচ্চা দায়িত্ব নিল যে, তারা সকালে এসে ঘুম থেকে তুলবে৷ দোতলা বাসা, আমরা দোতলায় থাকি৷ আমি বাচ্চাদের বললাম, পায়ে দড়ি বেঁধে জানালা দিয়ে ঝুলিয়ে দেব৷ তোমরা দড়ি ধরে টানতেই ঘুম ভেঙে যাবে৷

ঘুমানোর সময় জানালায় একটা বালিশ রেখে সেটার সঙ্গে দড়ি বেঁধে দড়ি ঝুলিয়ে দিলাম! যথাসময়ে শেষ রাতে পাশের বাড়ির বাচ্চারা আমাকে ঘুম থেকে তুলতে এসেছে৷ অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দড়ি বের করে যেই দড়ি ধরে টান দিয়েছে, দোতলার জানালা থেকে বালিশ এসে পড়েছে তাদের মাথায়৷ ভয়ে আতঙ্কে তাদের দাঁত কপাটি লাগার অবস্থা৷ তাদের ধারণা বেশি জোরে টান দিয়ে তারা জানালা দিয়ে টেনে আমাকেই নিচে ফেলে দিয়েছে!


আমেরিকার একটা মজার ঘটনা

গাড়ি করে যাচ্ছি, হঠাত্‍ করে দেখি রাস্তায় পানি জমেছে বলে পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে৷ সেই দেশে রাস্তা বন্ধ করলে পুলিশেরা সাধারণত কোন পথে যেতে হবে সেটা বলে দেয়, রাস্তাঘাটে সিগনাল থাকে৷ আজ সেরকম কিছু নেই৷ আমি কী করব বুঝতে না পেরে একটা গলিতে ঢুকে পড়লাম৷ গলিতে খানিকদূর গিয়ে ডানদিকে একটা রাস্তা পেয়ে সেটায় ঢুকে পড়লাম, সেটা দিয়ে খানিকদূর গিয়ে গেলাম বাম দিকে, লাভ হলো না বলে একটা মোড় ঘুরে আরো একটা রাস্তা নিলাম, কিছুদূর গিয়ে দেখি একেবারে অন্ধ গলি, রাস্তা সেখানেই শেষ৷ ডান-বাম সামনে-পেছনে কোথাও যাওয়ার রাস্তা নেই৷ কী করব বুঝতে না পেরে গাড়ি থেকে নেমে আমার চক্ষু চড়কগাছ৷ কোনদিকে যেতে হবে আমি জানি মনে করে আমার পিছু পিছু শ খানেক গাড়ি চলে এসেছে৷ পেছনে যতদূর দেখা যায় শুধু গাড়ি আর গাড়ি, বড় ছোট মাঝারি বাস-ট্রাক নিয়ে আমরা সেই অন্ধ গলিতে আটকা পড়ে গেছি!

নেহায়েত ভদ্রলোকের দেশ তাই সেদিন আমার পিটুনি খেতে হয়নি৷


স্কুলজীবনের একটা মজার ঘটনা

এই গল্পটাও মনে হয় কোথাও বলে ফেলেছি! যাই হোক আবার বলা যাক - স্কুলের এক স্যার মোটামুটি পাষণ্ড প্রকৃতির৷ দরিদ্র শিক্ষক, একদিন তার কিছু টাকার দরকার হলো৷ আমাকে বললেন মাকে বলে তাকে সেই টাকা এনে দিতে পারব কি না৷ আমি এবং আমার বোন এক ক্লাসে পড়ি৷ বাসায় এসে আমার মাকে বললাম, মা টাকা দিলেন৷ কাজেই সেই পাষণ্ড স্যারকে আমি এবং আমার বোন ঋণের জালে আবদ্ধ করে ফেললাম৷ আমরা দুই ভাইবোন তখন ক্লাস ফোরে পড়ি৷ কিন্তু সেই বয়সেই ঝানু মহাজনের মতো স্যারকে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করলাম৷ যেদিনই পড়া শেখা হতো না স্যারের হাতে মার খাবার সম্ভাবনা থাকত, ক্লাসের শুরুতে স্যারের কাছে গিয়ে গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলতাম, স্যার, আমার মা আজকে বিশেষ করে বলেছেন টাকাটা ফেরত দিতে৷

স্যার ফ্যাকাশে হয়ে যেতেন৷ কখনোই টাকা ফেরত দিতে পারতেন না, আমতা আমতা করে কৈফিয়ত দিতেন এবং অবধারিতভাবে আমাদের পড়া জিজ্ঞেস করতেন না, বরং সেই ক্লাসে আমাদের সঙ্গে মধুর ব্যবহার করতেন৷ স্যারের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল যখন একটা স্বপ্ন দেখার অর্থসংক্রান্ত বই চেয়ে সেই বইটা হারিয়ে ফেললেন৷ আমরা বই এবং টাকা দুটি বিষয় নিয়েই তাকে ব্ল্যাকমেইলিং করে গেলাম৷


দাম্পত্য জীবনের একটা মজার ঘটনা

বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন আমি হাত দেখতাম৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ছাত্রীরই হাত তখন দেখেছি৷ একজন আমাদের ক্লাসে পড়ে, নাম ইয়াসমীন হক৷ হাত দেখে বললাম, তোমার কোনো চিন্তা নেই, খুব বড়লোকের সঙ্গে তোমার বিয়ে হবে৷ সেই ইয়াসমীন হক আমেরিকাতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে এসেছে৷ আমার টাকার টানাটানি, তার থেকে কিছু টাকাও ধার করেছি৷ হঠাত্‍ করে মাথায় একদিন বুদ্ধি খেলে গেল, বিয়ে করলে নিশ্চয়ই আর ধারের টাকা ফেরত চাইবে না! কাজেই একদিন বিয়ে হয়ে গেল৷

বিয়ের প্রথম রাতে সাধারণত স্বামী-স্ত্রীতে অনেক মধুর বাক্যবিনিময় হয়৷ আমার সঙ্গে ইয়াসমীন হকের নিম্নরূপ বাক্যবিনিময় হয়েছিল :

ইয়াসমীন : কী মহাশয়? হাত দেখে বলেছিলেন বড়লোকের সঙ্গে বিয়ে হবে! এই হচ্ছে বড়লোকের নমুনা? আমার টাকা ধার করে আমাকে বিয়ে?

আমি : মানে ইয়ে-বলছিলাম কী, বড়লোক মানেই কি আর টাকা-পয়সার বড়লোক? হৃদয় দিয়েও বড়লোক হয়! (এটি এক বিন্দু বানানো নয় পুরোপুরি সত্যি ঘটনা!)


লেখালেখি নিয়ে একটা মজার ঘটনা

একজন অনেক দূর থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, আমি শুনেছি আপনি এখানে এসেছেন৷ সেটা শুনে সেই কতদূর থেকে আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি৷ এ রকম পরিবেশে মুখে যে রকম বিনয় ফোটানোর কথা আমি সে রকম বিনয় ফুটিয়ে ধরে আছি৷ ভদ্রলোক বললেন, আমি কী আপনার হাতটা একবার ছুঁয়ে দেখতে পারি? আমি হাত বাড়িয়ে বললাম, নিন৷

ভদ্রলোক আমার হাতটা টেনে নিজের বুকে চেপে ধরে আবেগ বিহ্বলিত হয়ে বলল, ইশ! আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না হুমায়ূন আহমেদের আপন ভাইয়ের হাতটা আমি ধরতে পেরেছি!


সন্তান-স্ত্রীকে নিয়ে একটা মজার ঘটনা

আমার স্ত্রী-পরিবারের কাছে কথা দিয়েছি, কখনোই আমাদের ব্যক্তিগত কথা পত্রপত্রিকায় বলব না - এবার কিছু বলে ফেলেছি৷ যদি সেজন্য আমি বিপদে পড়ি আপনারা উদ্ধার করবেন৷

শেষ গল্পটা এ রকম - আমার ছেলে ছোট, মাত্র কথা শিখেছে৷ তাকে আদব-কায়দা শেখাচ্ছি৷ তাকে বললাম, যখন তোমাকে কেউ ডাকবে তখন ভদ্রতা করে বলবে, জ্বি৷ ছেলে মুখ গম্ভীর করে শুনল৷ কয়দিন পরে আমি তাকে ডেকেছি, সে শব্দটা ভুলে গেছে৷ আবছা আবছা তার মনে আছে, শব্দটা একটা ইংরেজি অক্ষর, তাই উত্তর দিল, এইচ!
 

এই গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে পড়তে অথবা ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে


   

মন্তব্যসমূহ (00)

এই গল্পটি সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত থাকলে তা ইমেইল করে জানান