নাম না জানা সেই মেয়েটি

লিখেছেন - মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা    বিষয় - প্রেমের গল্প

লেখা হয়েছে - 25 জানুয়ারি 2008 তারিখে

   

ঘন্টাখানেক ধরেই আরিফ বিভিন্ন অজানা নাম্বারে ফোন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে৷ কিন্তু তার ভাগ্য খারাপ, বেশির ভাগ নাম্বারই ভুল পড়ছে৷ লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে, সেখানে এতবেশি সংখ্যক নাম্বার অবশ্য অব্যবহৃত হওয়ার কথা না৷ কিন্তু আরিফের ক্ষেত্রে যে হচ্ছে, তার কারণ আরিফ ট্রাই করছে অদ্ভুত অদ্ভুত নাম্বার৷ এই যেমন প্রথমেই সে তার নিজের নাম্বারটাকেই উল্টো দিক থেকে ডায়াল করল৷ এরপর করল তার নিজের নাম্বারটার সবগুলো ডিজিট ঠিক রেখে শুধু শেষ দুটো ডিজিটকে পাল্টে দিয়ে৷ সে হয়তো আরও ঘন্টাখানেক এভাবে চেষ্টা করে যেত এবং এক সময় হয়তো তার অধ্যাবসায়ের ফলস্বরূপ মিষ্টি কন্ঠের কোন তরুণীর সাথে তার পরিচয় হয়েই যেতো, কিন্তু বাধ সাধল তার রুমমেট সবুজ৷

সবুজ অনেকক্ষণ ধরেই আরিফের মোবাইল টেপাটেপি সহ্য করে আসছিল৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মুখ খুলল,

– দেখ আরিফ, আমি তোকে ফ্রি একটা পরামর্শ দেই? আমার মনে হয় তোর মানসিক ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত্‍৷

– কেন?

কারণ তুই যেভাবে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা অজানা নাম্বারে টেপাটেপি করিস, এটা মোটেই কোন সুস্থ মানুষের লক্ষণ না৷

– বাহ! অজানা নাম্বারে ট্রাই করা বুঝি অসুস্থতার লক্ষণ? জানতাম না তো! তাহলে তো অজানা মানুষের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করাটাও অসুস্থতার লক্ষণ হওয়া উচিত্‍৷ তুই যখন অপরিচিত মেয়েদের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করিস তখন কি আমি তোকে ধরে নিয়ে পাগলাগারদে ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসি?

– অজানা নাম্বারে ট্রাই করাটা মোটেই পাগলামির লক্ষণ না৷ কিন্তু তুই যেটা করছিস সেটা স্পষ্ট পাগলামির লক্ষণ৷ তুই অজানা নাম্বারে ফোন করছিস নতুন কোন মেয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য৷ ভালো কথা৷ কিন্তু তুই বেছে বেছে এমন নাম্বারে ফোন করছিস যেগুলোর অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা খুবই কম৷ তোর তো শালা অন্য সব কাজের মতো এটাও সেলফ কন্ট্রাডিক্টরি!

আরিফের আরেক রুমমেট নাজিম এতক্ষণ চুপচাপ দুজনের তর্ক শুনে মিটিমিটি হাসছিল৷ এবার সেও মুখ খুলল৷ মুচকি একটা হাসি দিয়ে আরিফকে উদ্দেশ্য করে বলল – আর তাছাড়া তুই কি ভেবেছিস এভাবে উল্টাপাল্টা নাম্বারে ফোন করলেই আকাশ থেকে কোন পরী নেমে এসে তোর সাথে প্রেমালাপ শুরু করে দিবে? ফর ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন, এই যুগে মোবাইল শুধু পরীদের হাতেই থাকে না, বস্তির মেয়েদের হাতেও থাকে৷ আমার তো ধারণা, তোর প্রথম কলটাই রিসিভ করবে কোন এক অজপাড়াগাঁয়ের অশিক্ষিত কোন মধ্যবয়সী মহিলা, যার প্রথম কথাটাই হবে, আফনে কেডা? কার লগে কতা কইবার ছান? তুই কি বসে বসে সেই মহিলার সাথে ইটিশ-পিটিশ করবি?

নাজিমের বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য হজম করতে না করতেই সবুজ যোগ করল – এই যদি হয় তোর ভবিষ্যত, তাহলে আর ফোন করে পয়সা খরচ করবি কেন? আমাদের কাজের বুয়া রহিমার মায়ের সাথেই ইটিশ-পিটিশ শুরু করে দে না!

– শালা চুপ করবি তোরা? আরিফ রীতিমতো হুঙ্কার ছাড়ল, তোরা তো শালা আরামেই আছিস৷ বাপের টাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিস আর একসাথে দুই তিনটা প্রেম করছিস৷ আমি নতুন এসেছি, এখনও কিছু চিনিনা জানিনা, তার উপর কলেজের পড়া আর টিউশানিতেই সারাদিন ব্যস্ত থাকি৷ তাই অবসরে একটু নতুন কারো সাথে বন্ধুত্ব করে সময়টা কাটাতে চাচ্ছি৷ কোথায় তোরা বন্ধু মানুষ একটু হেল্প করবি, তা না, যত্তোসব ফাও প্যাঁচাল৷

– ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে৷ একটু নরম হল সবুজ৷ হেল্প দরকার হলে বল৷ কিন্তু তুই যেই পথে এগোচ্ছিস, তাতে কোন হেল্পই কাজে আসবে না৷ তার চেয়ে তোকে একটা বুদ্ধি দেই – তুই আমার কাছ থেকে আমার পরিচিত কিছু সুন্দরীর ফোন নাম্বার নিয়ে সেগুলোতে চেষ্টা করে দেখ৷ কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে৷

সবুজের কথা হা হা করে উঠল নাজিম,

– বলিস কি তুই? এতগুলো মেয়ের ফোন নাম্বার ওকে একেবারে বিনামূল্যে দিয়ে দিবি? বন্ধু বলে টাকা যদি নাও নিস, অন্য কোন ব্যবস্থা করবি না? তা না হলে একবার যদি প্রেম হয়েই যায়, তখন তো এই শালা আমাদেরকে পাত্তাই দিবে না!

– তা অবশ্য ঠিক৷ আচ্ছা শোন আরিফ, তোর সাথে একটা অলিখিত চুক্তি হয়ে যাক৷ আমি তোকে আমার পরিচিত সাতটা মেয়ের ফোন নাম্বার দিব৷ এদের যেকোন একজনকে দেখলে তোর চোখ ট্যারা হয়ে যাবে৷ কিন্তু শর্ত হলো তুই এদের ব্যাপারে আমার সাথে কোন রকম আলোচনা করতে পারবি না৷ আমি দুই সপ্তাহের জন্য দেশের বাড়িতে যাচ্ছি৷ এর মধ্যেই যদি তুই এদের কারো সাথে মোটামুটি একটা ফ্রেন্ডশীপ দাঁড় করাতে পারিস, তাহলে কনগ্র্যাচুলেশান্স ফর ইউ৷ প্রয়োজনে তখন আমি তোকে আরও সাহায্য করব৷ আর যদি না পারিস, তাহলে আমাদের সামনে তুই আর কোনদিন এভাবে নাম্বার টেপাটেপি করতে পারবি না৷ তুই রাজি?

সবুজের কথা শেষ হতে না হতেই বাগড়া দিল নাজিম,

– আরে দাঁড়া, দাঁড়া৷ এত সহজ করিস না৷ যে নাম্বারগুলো দিবি সেগুলোর অর্ডার সামান্য উল্টাপাল্টা করে দিস৷ আরিফকে সেগুলো সাজিয়ে ঠিক নাম্বারটা বের করে নিতে হবে৷ ওর তো নাম্বার নিয়ে কম্বিনেশন পারমিউটেশনের অভ্যাস আছেই৷ তাই না?

– হ্যাঁ, বুদ্ধিটা খারাপ না৷ সো আরিফ, লেটস টেক ইট অ্যাজ এ চ্যালেঞ্জ৷ ওকে?

– ওকে৷ আই অ্যাকসেপ্ট ইট৷ শান্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল আরিফ৷

 

ঝোঁকের মাথার সবুজের চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করাটা কত বড় ভুল হয়েছে, সেটা আরিফ গত এক সপ্তাহ ধরে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে৷ রাজুর সাহায্য নিয়ে অনেক কষ্ট করে দুটো নাম্বার যদিও বা মিলাতে পেরেছে, দুমিনিটের বেশি কথা চালাতে পারেনি একজনের সাথেও৷ একজন তো রীতিমতো অপমানই করেছে তাকে৷ কিন্তু তৃতীয় নাম্বারটা মিলিয়ে সেটাতে ফোন করেই তার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল৷ ফোনটা রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে মিষ্টি একটা কন্ঠ তার নাম ধরে বলে উঠল – আরে আরিফ ভাই না, কি আশ্চর্য! আপনি হঠাৎ আমার নাম্বারে ফোন করলেন?

আরিফ এতই অবাক হল যে সে কোন উত্তর না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল৷ তাড়াতাড়ি নাজিমকে ডেকে ঘটনাটা খুলে বলল,

– বুঝতেই পারছিস মেয়েটা আমাকে চিনে এবং আমার নাম্বারও তার কাছে সেভ করা আছে৷ কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব সেটাই তো বুঝতে পারছি না৷ আমার নাম্বার তো শুধু তাদের ক্লাসের কয়েকটা মেয়ে ছাড়া এখানে অন্য কেউ জানে না! আচ্ছা মেয়েটাকে কি জিজ্ঞেস করব সে কে?

– আরে না গাধা, এখন তো তাও একটা সম্ভাবনা আছে৷ কিন্তু মেয়েটা যদি বুঝে তুই ওকে চিনতে পারছিস না, তাহলে শুরুতেই সম্ভাবনাটা ভেস্তে যেতে পারে৷ তুই বরং আবার ফোন কর৷ বল যে লাইন কেটে গিয়েছিল৷ আর ভান কর যে তুইও তাকে চিনিস৷ সাবধান ধরা খেয়ে যাস না আবার!

– ঠিক আছে৷ আচ্ছা শোন, আপনি করে বলব না তুমি করে বলব?

– এটা তো শালার আরেক মুশকিল৷ গলার আওয়াজে বয়স কি করকম মনে হয়? তোকে কি বলে ডেকেছে?

– বয়স আমার চেয়ে কম৷ আঠারোর বেশি হবে বলে মনে হয় না৷ আর আমাকে তো ভাইয়া আপনি করেই বলেছে৷

– তাহলে তুই তুমি করেই বল৷ দেখ যদি লাইগ্যা যায়!

কাজেই সবুজ আবার ফোন করল৷ রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল,

– কি ব্যাপার আরিফ ভাই, ফোন করেও আবার কেটে দিলেন?

– না, আসলে লাইনটা কেটে গিয়েছিল৷

– ও আচ্ছা! তা কি জন্য ফোন করেছিলেন?

– আসলে তেমন কোন কারণ নেই৷ এমনিই করেছি৷ কেমন আছ তুমি?

– এমনিই ফোন করেছেন? আপনার সাথে দেখা হলে আপনি ভালো করে আমার দিকে চোখ তুলে পর্যন্ত তাকান না, আর এখন বলছেন আমি কেমন আছি স্রেফ এটা জানার জন্য ফোন করেছেন?

মনে মনে একটু খুশি হল আরিফ৷ মেয়েটা যেই হোক, তার দিকে যেহেতু সে চোখ তুলেই ভালোমতো তাকাতে পারে না, তারমানে তার সাথে খুব বেশি কথাবার্তাও নিশ্চয়ই হয় নি৷ সুতরাং ধরা খাওয়ার সম্ভাবনাও কম৷ কাজেই সে কথা চালিয়ে যেতে লাগল – আরে বল কি? তোমার দিকে না তাকিয়ে আমি কার দিকে তাকাবো? তবে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে তাকানোটা তো অভদ্রতা ... নাকি তুমি তাই চাও?

আরিফের কথা শুনে হেসে উঠল অপর প্রান্তের মেয়েটি,

– যাক আপনি তাহলে হিউমারও করতে পারেন? দেখলে তো মনে হয় ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানেন না৷ আচ্ছা শোনেন, আপনাকে যে সেদিন বাসায় আসতে বললাম আসেননি কেন?

– আসলে যাওয়া হয় নি৷ মানে ... ঠিক সময় হয় নি৷

– হ্যাঁ, সময় হয় নি! মনে হয় কি কতো রাজকারবার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন৷ আচ্ছা শোনেন, আপনি সেদিন আমার বান্ধবীর সাথে এরকম ব্যবহার করলেন কেন?

– কই ... কিরকম ... মানে ...

নাজিম দেখল আরিফের ধরা খেতে বেশি বাকি নেই৷ কাজেই সে পাশ থেকে জোরে বলে উঠল – এই আরিফ, চল চল, তোর না আমার সাথে বাইরে যাওয়ার কথা? এখনও বসে আছিস কেন?

আরিফ আচ্ছা এখন রাখি বলে কোনমতে ফোন রেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল৷

– আরেকটু হলেই তো গেছিলাম৷ বাবারে বাবা!

– তবে যাই বলিস, মেয়েটার কথার ভঙ্গি যতটুক শুনলাম বেশ ইন্টারেস্টিং৷ তোর সাথে আর কিছু না হোক, ফ্রেন্ডশীপ হওয়ার একটা জোরালো সম্ভাবনা আছে৷

– তা অবশ্য হতে পারে৷ কিন্তু পরিচয়টাই তো জানি না৷ সবুজ শালা এ কি মুশকিলের মধ্যে আমাকে ফেলে গেল? আচ্ছা শোন, তুই একটা কাজ করতো, তোকে তো মনে হয় চিনবে না৷ তুই ফোন করে বের করার চেষ্টা কর তো মেয়েটা কে? নিজের নাম্বার থেকে করিস না৷ অন্য কারো নাম্বার থেকে অন্য কেউ সেজে কর৷

– ঠিক আছে৷ করছি৷

কিন্তু নাজিম ফোন করে তেমন কোন সুবিধা করতে পারল না৷ অপরিচিত নাম্বার দেখে ওপাশের মিষ্টি কন্ঠ প্রথমে কিন্নর কন্ঠে এবং শেষে কর্কষ কন্ঠে রূপান্তরিত হয়ে গেল৷ ভবিষ্যতে যেন দ্বিতীয়বার এই নাম্বারে ফোন না করে এ ধরনের হুমকি-ধামকি দিয়ে নাজিমকে ফোন ছাড়তে বাধ্য করল রহস্যময়ী সেই তরুনী৷ ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে এল নাজিম৷

 

সবুজ আসার আর তিনদিন বাকি৷ এরমধ্যে আরিফ বেশ কয়েকবার মেয়েটার সাথে কথা বলেছে৷ তাতে তাদের সম্পর্ক আগের চেয়ে আরকটু সহজ হলেও পরিচয় না জানার কারণে আরিফ আর বেশি কথা বলার সাহস করে নি৷ এদিকে মেয়েটা তার কলেজেরই কেউ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় কলেজের সহপাঠিনীদের উপর নজর রাখতে গিয়ে আরিফের ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়ের মতো অবস্থা৷ যার সাথে একটু কথা হয়, মনে হয় সেই তো নাম না জানা সেই মেয়েটি৷ আজ তো সে প্রায় নিশ্চিতই হয়ে গিয়েছিল যে তার এক সহপাঠি রিমিই হচ্ছে সেই মেয়েটি৷

কলেজ থেকে ফেরার পথে রিমি তাকে বলল – আচ্ছা গতকাল আমি তোমাকে ভাইয়ার নাম্বার থেকে দুইবার কল করেছিলাম তুমি ধরনি কেন?

গতকাল আরিফের নাম্বারে সত্যি সত্যি দুটো কল এসেছিল নতুন কোন নাম্বার থেকে৷ সে বাথরুমে ছিল বলে রিসিভ করতে পারেনি৷ কিন্তু সেই সময়ে সেই নাম না জানা মেয়েটির নাম্বার থেকেও দুটো মিসকল এসেছিল৷ আর সে যেহেতু সেই মেয়েটির বিষয়েই বর্তমানে বেশি চিন্তিত, তাই তার মাথায় শুধু দ্বিতীয়টার কথাই ছিল৷ প্রথমটার কথা তার মনেই ছিল না৷ কাজেই রিমির কথা শোনামাত্র সে অনেকটা লাফিয়ে উঠল, আচ্ছা তুমিই তাহলে সেই মেয়েটা! তার মনেই রইল না এটা যদি সেই মেয়েটাও হয়, তবুও তার সামনে এরকম বিস্ময় প্রকাশ করা উচিত্‍ হবে না৷

রিমি আরিফের কথা শুনে একটু অবাকই হল,

- হ্যাঁ আমিই সেই মেয়েটা৷ কেন তুমি আমাকে চিন না? নাকি আমি তোমাকে ফোন করতে পারি না?

– আরে না না, সেটা না৷ আমি তো ভাবতেই পারি নি যে তোমার সাথেই আমার প্রতিদিন ফোনে এত কথা হচ্ছ৷ অবশ্য আমি ভান করছিলাম ...

– আরিফ, তোমার কি মাথা ঠিক আছে? কি বলছ তুমি? তোমার সাথে আমার কোথায় কথা হচ্ছে? আমি তো কালই তোমাকে প্রথম ফোন করলাম৷

এতক্ষণে আরিফ তার ভুল বুঝতে পারল৷ লাভ নেই বুঝেও একটু হাসার চেষ্টা করল, আরে না, আমি তো তোমার সাথে এমনিই একটু মশকরা করছিলাম ...

রিমি আরিফের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল৷

 

কলেজ থেকে ফেরার সময় আরিফের মনে হলো, যথেষ্ট হয়েছে৷ ব্যাপারটার এখানেই সমাপ্তি টানা উচিত্‍৷ রিমি নেহায়েতই শান্ত স্বভাবের মেয়ে বলেই ব্যাপারটা হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে৷ কিন্তু অন্য কোন মেয়ে হলে সামনা সামনি কিছু না বললেও পরের দিন যে পুরা কলেজে তা রাষ্ট্র করে দিবে, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই৷ কলেজ ভর্তি ছাত্রছাত্রীদের কাছে হাসির পাত্র হওয়ার চেয়ে চ্যালেঞ্জে হেরে দিনরাত সবুজর টিটকারি শোনা হাজার গুণে ভালো৷ ভাবতে ভাবতে কখন যে বাসার সামনে চলে এসেছে, আরিফ সেটা খেয়ালই করে নি৷ হঠাত্‍ সে চমকে উঠল স্বপ্নার ডাকে৷ স্বপ্না তাদের পাশের বাসাতেই থাকে৷ স্বপ্নার ভাই তাদের বেশ ভালো বন্ধু৷

– আরিফ ভাই, কলেজ থেকে ফিরলেন বুঝি?

– হ্যাঁ৷ তুমি কেমন আছ স্বপ্না? স্বপ্নার মুখের দিকে সরাসরি না তাকিয়েই জবাব দিল আরিফ৷ কারণ স্বপ্নার এতই সুন্দরী যে আরিফ সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাতে অস্বস্ত্বিবোধ করে৷

– ভালো৷ আচ্ছা আপনি আমাদের বাসায় আসেন না কেন বলেন তো! সব সময় আসবেন আসবেন বলেন কিন্তু আসেন না৷ কবে আসবেন এবার ঠিক করে বলেন৷

আরিফের হঠাত্‍ মনে হল, আরে ফোনের সেই মেয়েটা স্বপ্না না তো! সেও তো সব সময় বাসায় যাওয়ার কথা বলে৷ নাহ্৷ মনে হয় না৷ স্বপ্নার মতো এলাকার সেরা সুন্দরী কেন ফোনে তার সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করবে? আর তাছাড়া স্বপ্না তো তার ফোন নাম্বারও জানে না৷

– কি ব্যাপার আরিফ ভাই, মনে হচ্ছে গভীর কোন সমস্যায় আছেন?

– না কই, কিছু না৷ কে বলল তোমাকে?

– বলতে হবে কেন? চেহারা দেখলেই বোঝা যায়৷ মনে হচ্ছে কদিন ধরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে শুধু কোন সমস্যা নিয়ে চিন্তা করছেন? কি ব্যাপার, প্রেম ঘটিত কোন ব্যাপার নাকি?

– কেন কেন? তোমার এরকম কিছু মনে হল কেন?

– না এমনিই বললাম৷ দুষ্টামি করলাম৷ কিছু মনে করবেন না৷ আসি আরিফ ভাই৷

আরিফের হঠাত্‍ মনে হল সে যদি পুরো ব্যাপারটা স্বপ্নাকে খুলে বলে তাহলে হয়তো স্বপ্না কোন বুদ্ধি বের করে দিতে পারে৷ একটা মেয়ের পরিচয় কিভাবে চালাকি করে বের করা যেতে পারে, সেটা আরেকটা মেয়েরই ভালো জানার কথা৷ কাজেই সে স্বপ্নাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল৷ স্বপ্না পুরো ব্যাপারটা শুনে প্রথমে একা একা বেশ কিছুক্ষণ হাসল৷ তারপর বলল,

– আপনি কি মেয়েটাকে ভালোবাসেন?

– দেখ, ভালোবাসা তো এভাবে হয় না! আমি শুধু এটা বলতে পারি তার সাথে কথা বলতে আমার ভালো লাগছে৷

– হুম৷ আচ্ছা ঠিক আছে আপনি তার সাথে দেখা করেন৷ তাহলেই হয়ে যায়৷

– কিভাবে দেখা করব? বাসার ঠিকানা চাইব? ওর তো ধারণা আমি ওর ঠিকানা জানিই৷ অন্য কোথাও দেখা করতে চাইলে যদি বলে যে, আজই তো সকালে দেখা হল, এখন আবার কি!

– হ্যাঁ, সমস্যাই একটা! আচ্ছা শোনেন, আপনি দুদিন ঘর থেকেও বের হবেন না, ওর সাথে যোগাযোগও করবেন না৷ তারপর একদিন ও ফোন করবে তখন বলবেন আপনি মোটর সাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন৷ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে এখন ঘরে আছেন৷ ও যেন আপনাকে দেখতে আসে৷ আমার ধারণা এটা কাজ করবেই৷

– বাহ্৷ তোমার মাথায় তো দেখা যাচ্ছে দারুণ বুদ্ধি! আরেকটা বুদ্ধি রেডি করে রাখ৷ এটা কাজ না করলে নেক্সট৷

– আর লাগবে না৷ আমি জানি এটাই কাজ করবে৷

 

আজ সবুজ ফিরে আসবে৷ আর আজই নাম না জানা সেই মেয়েটি আরিফকে দেখতে আসবে৷ আরিফ তাকে অনুরোধ করেছে সে যেন গোলাপি রংয়ের কোন ড্রেস পরে আসে৷ বেল বাজতেই আরিফ মাথায় ব্যান্ডেজ লাগিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল৷ কিন্তু যে ঘরে ঢুকল তাকে দেখে তড়াক করে লাফ দিয়ে বসে পড়ল৷ ঘরে ঢুকেছে স্বপ্না৷ তার পরনে জিন্স আর গোলপি কামিজ, হাতে একগুচ্ছ গোলাপ৷ আরিফ কোনমতে তোতলাতে তোতলাতে বলল – তুমি! এই সময়ে? তুমি কিভাবে জানলা যে আজকেই ঐ মেয়েটার এরকম ড্রেস পরে আমাকে দেখতে আসার কথা৷

স্বপ্না হাসতে হাসতে বলল,

– আপনার সমস্যাটা কি বলেন তো? আপনি ফোনে কথা বলার সময় এত স্মার্ট আর সামনা সামনি দেখা হলেই এত নার্ভাস হয়ে যান কেন? আমিই যদি সেই মেয়েটা হই, আপনার কি কোন সমস্যা আছে?

– তুমি? তুমি সেই মেয়েটা? আরিফকে দেখে মনে বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য আজ সেচ্ছায় তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে৷

– হ্যাঁ আমিই৷ হাসতে হাসতে উত্তর দিল স্বপ্না৷ হাতের গোলাপগুলো আরিফের দিকে বাড়িয়ে বলল – অনেক হয়েছে৷ আর ঢং করে বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে না৷ এবার উঠেন৷

আরিফের বিস্ময় তখনও কাটেনি৷ সে বলল,

– কিন্তু তুমি আমার নাম্বার তোমার সেটে সেভ করে রেখেছিলা কেন?

– আমি সেভ করিনি৷ আমি সেদিন আমার সিম দিয়ে ভাইয়ার সেটটা ব্যবহার করছিলাম৷ আর ভাইয়ার সেটে আপনার নাম্বারটা সেভ করা ছিল৷ বুঝলেন?

আরিফ বুঝল নাকি বুঝল না, সেটা ঠিক বোঝা গেল না৷ সে তখনও বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটাই কাটিয়ে উঠতে পারে নি৷ স্বপ্না গড়গড় করে কথার তুবড়ি ফুটিয়ে যাচ্ছে আর আরিফ মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে৷ আর তাদের দুজনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে এইমাত্র দেশের বাড়ি থেকে ফিরে আসা সবুজ৷ সে কি ভাবতে পেরেছিল, আপাতদৃষ্টিতে সহজ সরল টাইপের এই ছেলেটা মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় অচেনা একটা একটা মেয়ের পরিচয় জোগাড় করে তাকে একেবারে বাসায় হাজির কর ফেলতে পারবে?

 

এই গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে পড়তে অথবা ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে


   

মন্তব্যসমূহ (00)

এই গল্পটি সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত থাকলে তা ইমেইল করে জানান