একুশ তুমি কোথায়!

লিখেছেন - মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা    বিষয় - একুশের বিশেষ গল্প

লেখা হয়েছে - 20 ফেব্রুয়ারি 2005 তারিখে

   

২০০৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি৷ আসন্ন এস.এস.সি. পরীক্ষা নিয়ে রীতিমত ব্যস্ত আমি৷ পীথাগোরাসের উপপাদ্যটা আরেকবার করব কি করব না ভাবছিলাম, এমন সময় আমার ছোটভাই তালহা এসে বলল, ভাইয়া, চল৷

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়?

কেন, স্কুলে! নামিয়ে দিয়ে আসবে না আমাদের?

আজ আবার স্কুল কিসের? আজ ২১শে ফেব্রুয়ারী না? ভাগ এখান থেকে!

ক্লাস ওয়ানের ছাত্র তালহা আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল৷ বুঝলাম, ২১শে ফেব্রুয়ারী ব্যাপারটা তার কাছে এখনও স্পষ্ট নয়৷ ততক্ষণে আমার ছোট বোন তিথিও তালহার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ তার পরনে স্কুল ড্রেস এবং কাঁধে স্কুলের ব্যাগ৷ আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না৷ জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, আজ শহীদ দিবস - আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস৷ তোদের স্কুল ছুটি দেয়নি?

না তো!

ছুটি দেয়নি? তাহলে কি কোন অনুষ্ঠান হবে?

না, কিছুই তো বলেনি! কোন নোটিসও দেয়নি৷

এটা আবার কি ধরনের কথা? সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না হয় নাই করল, তাই বলে স্কুল ছুটিও দিবে না?

আমাদের আবার স্কুল! মুখ বাঁকিয়ে বলল তিথি, নুরু সাহেবের কাছে এসব জাতীয় বা আন্তর্জাতিক দিবসের মূল্যবোধের কোন মূল্য আছে? তার কাছে তো ...

উল্লেখ্য, সিরত বাংলাদেশী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের আসল নাম মোঃ নূরন্নবী হলেও ছাত্রছাত্রীদের কাছে তিনি নুরু সাহেব, বোম্বলি (সিলিন্ডারের আরবী শব্দ), ডাউনলোড প্রভৃতি নামে পরিচিত৷

তিথি সম্ভবত আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কথা শেষ করার আগেই আম্মুর ডাকে তাকে চলে যেতে হল৷ আমি তালহার দিকে তাকিয়ে বললাম, দশ মিনিট অপেক্ষা কর৷ আজকে একটু দেরী করেই যাব৷ নুরু সাহেবের সাথে কথা আছে আমার৷

তালহা ঘাড় কাত করে পাশের রুমে চলে গেল৷

 

সিরত বাংলাদেশী স্কুলের ক্লাস শুরু হয় বিকেল সাড়ে চারটা বাজে৷ অন্য সবাই সাড়ে চারটা বাজার আগেই স্কুলে হাজির হলেও নুরু সাহেব সব সময়ই দেরি করে স্কুলে আসেন৷ যদি তিনি কোনদিন ভুলেও চারটা চল্লিশ মিনিটে স্কুলে এসে হাজির হন, তাহলেও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়৷ এক জন আরেক জনকে জিজ্ঞেস করে, ‘কিরে, নুরু সাহেবের ঘড়ি কি আজ আধ ঘন্টা ফাস্ট হয়ে গেছে?

তিথি এবং তালহাকে নিয়ে আমি আজ বেশ দেরী করেই স্কুলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম৷ আমার ইচ্ছে ছিল, নুরু সাহেবের সাথে দেখা করে একুশে ফেব্রুয়ারীতেও স্কুল খোলা রাখার তাৎপর্যটা জিজ্ঞেস করব৷ আমরা স্কুলে গিয়ে পৌঁছলাম চারটা পঁয়তাল্লিশে৷ কিন্তু মিঃ ডাউনলোড তখনও হাজির হননি৷ আমি আরও মিনিট দশেক অপেক্ষা করে ঘরে ফিরে গেলাম৷

সেদিন রাতে স্কুল ছুটির সময় আবার স্কুলে গেলাম এবং সৌভাগ্যবশত নুরু সাহেবকেও স্কুলে পেয়ে গেলাম৷ তিনি তখন নামায পড়া শেষ করে অফিস রুমে ঢুকছিলেন৷ তার কাছে গিয়ে কোন প্রকার ভনিতা না করে সরাসরি ছুটি না দেওয়ার কারণটা জানতে চাইলাম৷ উত্তরে আমাকে পাশ কাটিয়ে অফিস রুমে ঢুকতে ঢুকতে তিনি বললেন, ও, আজ একুশে ফেব্রুয়ারী নাকি? অসুবিধা নেই, একবছর ছুটি না দিলে কি আর আসবে যাবে?

বিস্ময়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম৷ কি অবলীলায় কথাগুলো বলে চলে গেল! কন্ঠে বিন্দুমাত্র বিব্রত বোধটুকুও নেই!

স্কুলের ভেতর থেকে নার্সারী-কেজির ছাত্রছাত্রীদের চ্যাঁচামেচিতে সৃষ্ট আশি ডেসিবলের শব্দ তরঙ্গায়িত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে৷ ফেব্রুয়ারির তীব্র ভূমধ্যসাগরীয় হিমেল হাওয়া দু’কানের পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে চলে যাচ্ছে৷ স্কুলের অনতিদূরে ওয়াটার প্লান্টের বিকট শব্দে বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে৷ আসন্ন লিবিয়ার জাতীয় দিবস এসনাঈন মারেস (দোসরা মার্চ) উদযাপন উপলক্ষে রাস্তায় টহলরত পুলিশের পেট্রোল কারের সাইরেনের তীক্ষ্ণ শব্দ কর্ণমূল ভেদ করে মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে৷ কিন্তু আমি সেসব কিছুই শুনতে পারছি না৷ আমার কানে শুধু একটাই কথা বাজছে - একবছর ছুটি না দিলে কি আর আসবে যাবে?

 

লিবিয়ায় নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত জনাব এফ. এম. গোলাম হোসেন সর্বমোট পাঁচবার আনুষ্ঠানিকভাবে সিরত বাংলাদেশী স্কুল সফর করেছিলেন৷ প্রতিবারই প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর বক্তৃতার মধ্যে কিছু কমন বিষয় ছিল৷ এই যেমন, পাঁচবারই তিনি বক্তৃতার মধ্যে দুটি করে গল্প বলেছিলেন৷ প্রতিবারই গল্পগুলো ছিল অভিন্ন৷

তাঁর একটি গল্প ছিল এরকম যে, তিনি যখন শারজাহে (ম্যানচেস্টারও হতে পারে; ঠিক মনে পড়ছে না) ছিলেন, তখন সেখানকার বাংলাদেশী কমিউনিটির এক অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রধান অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল৷ সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে কিছু কথা বলেছিলেন৷ সেই অনুষ্ঠান শেষে ক্লাস টেনের এক মেয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, স্বাধীনতা জিনিসটা কি? অর্থাৎ, সেই কমিউনিটি বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন ছিল যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে সেখানকার দশম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদেরও কোন ধারণা ছিল না৷

রাষ্ট্রদূত মহোদয়ের গল্পটা সত্যই হোক আর তাঁর বক্তব্যকে শ্রোতাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যই হোক, সেটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়৷ বরং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে, সিরত বাংলাদেশী স্কুলের অবস্থাও দিনে দিনে সেই বাংলাদেশী কমিউনিটির মত হয়ে যাচ্ছে৷ নুরু সাহেবের প্রধান শিক্ষকত্বের চার-পাঁচ বছরের মধ্যে এই স্কুলে একবারও একুশে ফেব্রুয়ারী পালিত হয়নি৷ আর ২০০৪ সালে তো ছুটিও দেওয়া হল না৷ অথচ এক সময় এই স্কুলে কি আড়ম্বরের সাথেই না এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালন করা হত! ছাত্রছাত্রীরা কি সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করত, জ্বালাময়ী কন্ঠে বক্তব্য রাখত! আর এখন?

যদি এই অবস্থা চলতে থাকে, তবে সেদিন খুব বেশি দুরে নয়, যেদিন এই স্কুল থেকে একুশ এবং একুশের চেতনা সমূলে বিলুপ্ত হবে৷ সেদিন কোন সচেতন ব্যক্তি যদি এখানে একুশের চেতনা খুঁজতে চান, তবে নিঃসন্দেহে তাঁকে সিরতের তরীক্ব রাইসীতে (রাজপথে) নেমে চিৎকার করে গাইতে হবে - ও একুশ, তুমি কোথায়!

এই গল্পটি হোমভিউ বাংলাদেশ ডট কমের ২০০৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত গল্প প্রতিযোগিতায় অভিজ্ঞতা বিভাগে শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিল৷

 

এই গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে পড়তে অথবা ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে


   

মন্তব্যসমূহ (00)

এই গল্পটি সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত থাকলে তা ইমেইল করে জানান