লিখেছেন - মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা বিষয় - রহস্য গল্প
লেখা হয়েছে - 25 অক্টোবর 2005 তারিখে
ব্যাপারটা ঘটেছিল আমার চোখের সামনেই৷ আমি গিয়েছিলাম সিরত শহরের একমাত্র সাইবার ক্যাফে আলাম-আল-শাবাকাতে৷ ঘন্টা দেড়েক সেখানে কাটিয়ে যখন ঘরে ফিরে আসছিলাম, ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা৷ আমি তখন সবেমাত্র ইউ মার্কেটের সামনের চৌরাস্তাটা পার হচ্ছি৷ হঠাত্ একটা পরিচিত গাড়ির হর্ণ শুনে পেছনে তাকিয়ে দেখি আমাদের প্রিয় শফিক আঙ্কেল তার নতুন কেনা মাজদা সিক্স-টু-সিক্স গাড়িটা চালিয়ে সিগনাল অতিক্রম করছেন৷ আমি তার উদ্দেশ্যে হাত নাড়তে যাব, এমন সময় দেখলাম নীল রং-এর একটা মিতসুবিশী পিকআপ প্রচন্ড স্পীডে শফিক আঙ্কেলের গাড়িটার দিকে ছুটে যাচ্ছে আর তার ড্রাইভারটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে গাড়ির স্টিয়ারীং হুইলের উপর ঝুঁকে আছে৷ তার এই ঝুঁকে থাকার ভঙ্গিটা কোথায় যেন দেখেছি, এ কথা ভাবতে না ভাবতেই পিকআপটা বাম দিক থেকে (লিবিয়া সহ আফ্রিকা এবং আরবের অধিকাংশ দেশের গাড়িগুলোর ড্রাইভিং সিট থাকে বাম পাশে) শফিক আঙ্কেলের গাড়ির ড্রাইভিং সিটের ঠিক পাশে প্রচন্ড জোরে আঘাত হানল৷
আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে, রাস্তার পাশের খেজুর গাছের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, গাড়ির কাঁচ ভেঙ্গে যাচ্ছে, শফিক আঙ্কেলের মুখ সেই ভাঙ্গা কাঁচের টুকরায় রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং শফিক আঙ্কেলের মুখ দিয়ে আর্ত চিত্কার বেরিয়ে আসছে৷ কিন্তু কী আশ্চর্য! শফিক আঙ্কেলের এই আর্ত চিত্কারও আমার হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারল না৷ আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় জুড়ে তখনও বিরাজ করছিল সেই পিকআপ ড্রাইভারটার ছবি৷ আমার কেন যেন খুব জোরালভাবে মনে হতে লাগল, সেই ড্রাইভারটাকে আমি নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও দেখেছি৷ বিশেষ করে তার সেই ঝুঁকে থাকার ভঙ্গিটা আমার কাছে খুবই পরিচিত মনে হতে লাগল৷ কিন্তু আমি কোনভাবেই মনে করতে পারলাম না কোথায় দেখেছি তাকে৷ ভাবতে ভাবতে আমার মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেল এবং দেখতে দেখতে একসময় আমি রাস্তার পাশেই বসে পড়লাম৷
জ্ঞান ফেরার পর আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম মক্তব লিবিয়া বুকস্টলের ভেতর৷ বুকস্টলের মালিক মোয়াম্মার-আল-জাফরানী আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন৷ তার কাছ থেকে জানতে পারলাম, অ্যাক্সিডেন্টের শব্দ শুনে দোকান থেকে বেরিয়েই তিনি আমাকে রাস্তার পাশের লাইটপোস্টের গা ঘেঁষে ধীরে ধীরে পড়ে যেতে দেখেন৷ সেখান থেকে তিনি আমাকে তার দোকানের ভেতরে নিয়ে আসেন৷ আমার কাছে তখন নিজের অবস্থার চেয়েও শফিক আঙ্কেলের অবস্থার গুরুত্ব বেশি৷ জিজ্ঞেস করলাম, অ্যাক্সিডেন্ট করা লোকটা এখন কোথায়?
অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ইবনে সীনায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ তার অবস্থা খুবই সিরিয়াস৷ মাথা থেকে প্রচুর রক্ত পড়ছিল৷ বললেন জাফরানী৷
আমি দেরি না করে তখনই তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইবনে সীনা হসপিটালের দিকে রওয়ানা হলাম৷ ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে প্রবেশ করার আগেই আমি জানতে পারলাম শফিক আঙ্কেল মারা গেছেন৷ যে ইরাকি ডাক্তারের কাছ থেকে আমি খবরটা পেলাম তিনি বললেন, মৃত্যুর আগে তিনি শুধু দুটো শব্দই উচ্চারণ করছিলেন৷ একটা ছিল "ত্বোহা" এবং অন্যটা ছিল "আলম"৷
বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গেলাম৷ যতটা না শফিক আঙ্কেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে, তার চেয়ে বেশি ডাক্তারের পরবর্তী কথাগুলো শুনে৷ যে ব্যক্তি নিজের মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত, সে নিজের কথা, নিজের স্ত্রীর কথা, পুত্র-কন্যার কথা বাদ দিয়ে কেন অন্য লোকের কথা ভাববে? আমার কথা না হয় বাদ দিলাম; আমাকে হয়তো তিনি দুর্ঘটনার পূর্ব মুহূর্তে দেখে থাকবেন, সেজন্যই হয়তো আমার নাম উচ্চারণ করেছেন৷ কিন্তু আলম আঙ্কেলতো তখন সেখানে ছিলেন না! তা ছাড়া আলম আঙ্কেলের সাথে তো তার গত ছয় মাস ধরে কথা বলাবলিও বন্ধ! তা হলে তিনি মৃত্যুর আগে বার বার আলম আঙ্কেলের নাম উচ্চারণ করছিলেন কেন? আমি কোন উত্তর খুঁজে পেলাম না৷
শফিক আঙ্কেলের মৃত্যু সংবাদ শুনেই হোক, তার মৃত্যুর আগে আমার এবং আলম আঙ্কেলের নাম উচ্চারণ করার রহস্যের কথা ভেবেই হোক, অথবা সেই পিকআপ ড্রাইভারটার কথা চিন্তা করেই হোক, সেদিন রাতে ঘরে ফিরেই আমি প্রচন্ড জ্বরে পড়লাম৷ ফলে পরপর তিনদিন পর্যন্ত আমি শফিক আঙ্কেলদের বাসায় যেতে পারলাম না৷ তবে মোবাইল ফোনের কল্যাণে ঘরে বসেই নিয়মিত সব খবরাখবর পেতে লাগলাম৷
এত বড় একটা দুঃখজনক ঘটনার মধ্যেও সবচেয়ে আনন্দদায়ক সংবাদ হল, যে আলম আঙ্কেলের সাথে গত ছয় মাস ধরে দেশের জমিজমা সংক্রান্ত পাঁচ লাখ টাকার ব্যাপার নিয়ে শফিক আঙ্কেলের কথা বলাবলি বন্ধ, সেই আলম আঙ্কেল পর্যন্ত শফিক আঙ্কেলের মৃত্যু সংবাদ শুনে শিশুর মত মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছেন, শফিক আঙ্কেলের বাসায় গিয়ে শফিক আন্টির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন, যে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে সমস্যা ছিল, সেই পাঁচ লাখ টাকার উপর থেকে পর্যন্ত তার অধিকারের দাবি উঠিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং শফিক আন্টি ও তার দুই ছেলে-মেয়ে সামীর-সামীয়াকে তার নিজের বাসায় নিয়ে তাদেরকে দেখাশোনার ভার গ্রহণ করেছেন৷
এখানে বলে রাখা দরকার যে, আলম আঙ্কেল এবং শফিক আঙ্কেল পরস্পর আপন চাচাতো ভাই৷ আলম আঙ্কেলের এই পরিবর্তন সিরতের সবাইকে নাড়া দেয়৷ ঘুরে ফিরে সবার একটা কথাই মনে হয় – আলাহর কী অপার মহিমা! তিনি একজনের মৃত্যুর মাধ্যমে আরেকজনের জীবনের গতি কী সুন্দরভাবে পাল্টে দেন!
শফিক আঙ্কেলের লাশ দেশে পাঠানোর আয়োজন করা হচ্ছে৷ একটা লাশ প্লেনে বহন করতে হলে তিন সিটের প্রয়োজন হয়৷ সে হিসেবে শফিক আঙ্কেলের লাশ এবং শফিক আন্টি ও সামীর-সামীয়াকে দেশে পাঠানোর জন্য প্রায় ৮০০০ দিনার (বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় চার লাখ টাকা) দরকার৷ এই বিপুল পরিমাণ টাকার ব্যবস্থা করার জন্য চাঁদা তোলা হচ্ছে৷ সিরতের বাংলাদেশীরা তাদের সাধ্য এবং শফিক আঙ্কেলের সাথে ঘনিষ্ঠতা অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৫০ দিনার থেকে শুরু করে ১০০০ ডলার পর্যন্ত দিল৷ সিরত ছাড়াও ত্রিপলী, বেনগাজী এবং মাসরাতা থেকে সর্বমোট ১২,৫০০ দিনার উঠল৷ আর কয়েকদিনের মধ্যেই তাদেরকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে৷
ইতোমধ্যে আলম আঙ্কেলের আরো পরিবর্তন হয়েছে৷ যে আলম আঙ্কেলকে জীবনে কোনদিন জুমার নামাযে দেখা যায় নি, সেই আলম আঙ্কেল এখন গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জোদের নামাযও পড়েন৷ সপ্তাহে দুটো করে নফল রোযা রাখেন৷ তার পোশাক-আশাকেও পরিবর্তন এসেছে৷ গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, মুখে দাড়ি এবং হাতে সার্বক্ষণিক তসবীহ৷ তার পরিবর্তনের কথা প্রশংসামূলকভাবে সিরতের আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে৷
শফিক আঙ্কেলদেরকে দেশে পাঠানো যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন একদিন আলম আঙ্কেল বললেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে, ভাই৷ এখন এত কষ্ট করে লাশটা দেশে পাঠানোর কি দরকার? ইসলাম ধর্মের নিয়মে কেউ মারা গেলে তার লাশ নিয়ে টানা-হেঁচড়া করা না জায়েজ৷ আমি বলি কি, আপনারা ভাইকে এখানেই মাটি দেন৷ আর যে টাকাগুলো উঠেছে, সেগুলো নিয়ে আমি দেশে গিয়ে ভাবীদের একটা ব্যবস্থা করে দেই৷ না হলে তো দেশে গিয়ে তাদেরকে পথে বসতে হবে৷ আপনারা কোন চিন্তা করবেন না৷ এই ১২,৫০০ দিনার দিয়ে যদি দেশে একটা দোকানও তুলে দিতে পারি, তাহলেও আর ছেলে-মেয়েদুটোর লেখা-পড়ার খরচ নিয়ে ভাবতে হবে না৷
আমরা এই দুঃখের সময়ও শফিক আঙ্কেলের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য আলম আঙ্কেলের চিন্তা-ভাবনা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না৷ কাজেই শফিক আন্টির আপত্তি সত্ত্বেও আমরা শুধুমাত্র ছেলে-মেয়েদুটোর ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সেই শুক্রবারে জুমার নামাজের পর শফিক আঙ্কেলকে হাম্মালী গোরস্থানে কবর দিয়ে এলাম৷ তার এক সপ্তাহ পর চাঁদার ১২,৫০০ দিনার আলম আঙ্কেলকে বুঝিয়ে দিয়ে এয়ারপোর্টে গিয়ে তাকে এবং শফিক আন্টি ও সামীর-সামীয়াকে বিদায় দিলাম৷ আলম আঙ্কেল চোখের পানি মুছতে মুছতে বার বার বলতে লাগলেন, আপনারা দোয়া করবেন৷ দেশে গিয়ে যেন এই এতিম ছেলে-মেয়েদুটোর একটা বিহিত করে দিতে পারি৷ আপনারা দোয়া করবেন, আমি যেন সত্ভাবে এই টাকাগুলো ছেলে-মেয়েগুলোর পেছনে খরচ করতে পারি৷ তার কথা শুনে আমরাও চোখের পানি মুছতে লাগলাম৷
শফিক আন্টিদেরকে দেশে পাঠানোর পর পাঁচ বছর কেটে গেছে৷ এই পাঁচ বছরে একবারও তাদের কোন খোঁজ-খবর পাইনি৷ শফিক আন্টি এবং সামীর-সামীয়ার অবস্থা জানার জন্য খুব কৌতুহল হচ্ছিল৷ এই সময় আমার একবার আড়াই মাসের ছুটিতে দেশে যাওয়ার সুযোগ হল৷ প্রথম প্রথম ব্যস্ততার জন্য ওদের কথা মনেই আসল না৷ দুই মাস পর একদিন কোন কারণ ছাড়া হঠাৎ করেই মনে পড়ল শফিক আন্টির কথা৷ সাথে সাথে খোঁজ-খবর শুরু করলাম৷ একটানা এক সপ্তাহ খোঁজাখুঁজি করার পর আলম আঙ্কেলের ঢাকার বাসার ঠিকানা পেলাম - পুরানো এয়ারপোর্টের রানওয়ের উত্তর মাথায়, শেওড়াপাড়ায়৷ সাথে সাথে রওয়ানা হয়ে গেলাম৷
বাসাটা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না৷ চারতলা একটা বিল্ডিং৷ কলিংবেল টিপলাম৷ দরজা খুলে দিল বারো-তেরো বছর বয়সী দুঃখী দুঃখী চেহারার এক কিশোরী৷ পোশাক-আশাকে মনে হচ্ছে কাজের মেয়ে হবে হয়তো৷ তবে চেহারা-ফিগার খুবই সুন্দর, কাজের মেয়ের সাথে একেবারেই বেমানান৷ কেমন পরিচিত পরিচিত৷ জিজ্ঞেস করল, কাকে চান?
গলার স্বর শুনে আমি বিমূঢ় হয়ে গেলাম৷ কোনমতে বললাম, তুমি সামীয়া না?
হ্যাঁ! একটু অবাক হয়ে উত্তর দিল মেয়েটি, আপনি কে?
আমি ত্বোহা৷ লিবিয়ায় ছিলাম৷ মনে আছে তোমার?
আপনি? সামীয়ার গলার স্বর শুনে আমার মনে হল সে কেঁদে ফেলবে৷
কি হয়েছে তোমার? জিজ্ঞেস করলাম আমি, তোমার এরকম অবস্থা কেন? তোমার আম্মা কোথায়? সামীর কোথায়?
উত্তর না দিয়ে সামীয়া ফোঁপাতে লাগল৷ এক সময় ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল, আম্মা মারা গেছে গত বছর৷ ভাইয়া জেলে৷
কি? আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি৷
হ্যাঁ৷ দেশে আসার পরপরই আলম চাচা আমাদের সব সম্পত্তি দখল করে ফেলে৷ কোন মতে আমাদেরকে তার ঘরের কাজের লোকের মতো বাঁচিয়ে রাখে৷ গত বছর আম্মার সাথে তার একবার ঝগড়া হয়৷ তখন সে আম্মার গায়ে হাত তোলে৷ খুব নির্যাতন করে৷ এর পরপরই আম্মা মারা যায়৷ ভাইয়া রাগের মাথায় তাকে মারতে গেলে সে পুলিশ এনে ভাইয়াকে ধরিয়ে দেয়৷
সামীয়ার কথা শুনতে শুনতে আমি যেন এক অন্যভুবনে চলে যাই৷ আমার মনে হতে থাকে, তাহলে নামায পড়া, রোযা রাখা, শফিক আন্টিদের প্রতি মমতা দেখানো, পাঁচ লাখ টাকার দাবি ছেড়ে দেওয়া, এ সবই ছিল আলম আঙ্কেলের অভিনয়? তার মনে তখনই ছিল শফিক আঙ্কেলের সব সম্পত্তি দখল করার পরিকল্পনা? শফিক আঙ্কেলের লাশ দেশে না আনার পেছনেও তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই ১২,৫০০ দিনার মেরে দেওয়ার প্ল্যান? তার ভালোমানুষির পুরোটুকুই ছিল একটা মুখোশ? সেই মুখোশের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল এরকম একটা জঘন্য পরিকল্পনা? আমার মাথাটা আবার ঘুরতে লাগল৷
হঠাত্ আমার চোখে পড়ল ঘরের ভেতর একটা ছোট ছেলে একটা চেয়ারের উপর বসে গাড়ি চালানোর মতো ভঙ্গি করছে৷ আমার সারা শরীর বেয়ে যেন একটা শীতল স্রোত প্রবাহিত হয়ে গেল৷ ছেলেটার গাড়ি চালানোর ভঙ্গি ছিল ঠিক সেই পিকআপ ড্রাইভারটার সেই ভঙ্গিটার মতো৷ আমি কোনমতে সামলে নিয়ে সামীয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ছেলেটা কে?
আলম চাচার ছেলে৷ উত্তর দিল সামীয়া৷
বিদ্যুত্ চমকের মত আমার মনে পড়ে গেল সেই পিকআপ ড্রাইভারটা আসলে ছিল আলম আঙ্কেল৷ আলম আঙ্কেল ছিল খুব ভালো ড্রাইভার৷ আমি যখন তার কাছে ড্রাইভিং শিখতাম, তখন একদিন সে আমাকে শিখিয়েছিল, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়লে কিভাবে গাড়ি কন্ট্রোল করতে হয়৷ সেই তখনই আমি তার সেই অদ্ভুত ঝুঁকে থাকার ভঙ্গিটা খেয়াল করেছিলাম৷ আর সে জন্যই পিকআপ ড্রাইভারটার ঝুঁকে থাকার ভঙ্গিটা আমার কাছে এতটা পরিচিত মনে হচ্ছিল৷ আর একই কারণে শফিক আঙ্কেল মৃত্যুর আগে আমার নাম এবং আলম আঙ্কেলের নাম উচ্চারণ করেছিলেন৷ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আলম আঙ্কেলই তাকে খুন করতে চেয়েছিল আর আমি ছিলাম সেই খুনের সাক্ষী৷
সামীয়া আমার বিচলিত চেহারা দেখে জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?
নাহ্৷ কিছু না৷ একটা হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েও সেটা গোপন করে গেলাম আমি৷ যেই খুনের কোন প্রমাণ নেই আমার কাছে, যেই খুনের অপরাধীকে ধরার সাধ্য নেই আমার, সেই খুনের কথা প্রকাশ করার কোন মানে আছে?