ঈশ্বরের মতো যারা আমাদের মাথার ওপর আছেন

লিখেছেন - সুমন্ত আসলাম    বিষয় - ব্যাঙ্গাত্মক

সংগ্রহ করা হয়েছে - প্রথম আলোর আলপিনের বাউন্ডুলে থেকে

   

খবরগুলো পড়ার পরপরই টের পেলাম মাথায় দুটো শিং গজিয়েছে আমার, চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে, শরীর হয়ে গেছে কঙ্কালের মতো৷ মানে আমি ভূত হয়ে গেছি৷ রূপকথার গল্পে ভূতরা সব পারে, যখন যা হতে চায় হতে পারে, যেখানে ইচ্ছে সেখানে যেতে পারে মুহূর্তেই, এখন আমিও পারি৷ খবরগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমি তাই চলে গেলাম দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে৷ তারপর?

ভাতের সঙ্গে একটা কেঁচো ছিল, সেটা ফেলে দিয়ে পচা সবজি দিয়ে বেশ তৃপ্তি নিয়ে দুপুরের খাবারটা খেয়ে ফেললাম৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে যে এত চমত্কার খাবার রান্না হয় তা জানা ছিল না আমার৷ সালাদের বদলে কেঁচো, তাজা সবজির বদলে পচা সবজি - ওয়াও! কী ইউনিক আইডিয়া! আমার মতো অনেকেই খাচ্ছে, মজা নিয়ে খাচ্ছে, তাদের খাওয়া দেখে আমার আবার একটু ক্ষুধা লেগে গেল৷ পচা সবজি দিয়ে আমি আরও এক প্লেট খাবার খেয়ে নিলাম৷ তারপর স্রষ্টার শুকরিয়া আদায়ের জন্য বললাম - আলহামদুলিল্লাহ!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে মনে হলো - না, এখানে সবজি-টবজি কিছু খাব না, মাংস খাব৷ ক্যান্টিনের চেয়ারে বসেই একটা বয়কে ডেকে বললাম, ভাতের সঙ্গে কী কী আছে?

বয় এক নাগাড়ে বলে গেল, মাছ, ভাজি, ডাইল, ভর্তা, মাংস৷

কিসের মাংস আছে?

শেয়াল আর কুকুরের৷ তবে এগুলো আমরা খাসির মাংস বলে বিক্রি করি৷ শুধু আপনাকেই আসল কথাটা বললাম৷

ক্যান্টিনের চারপাশটা একবার দেখে নিলাম আমি৷ সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে৷ সবাই খাচ্ছে, সুতরাং আমার খেতে অসুবিধা কোথায়? পুরো তিন প্লেট ভাত আমি খেয়ে ফেললাম শেয়াল আর কুকুরের মাংস দিয়ে৷ সত্যি, কোনোভাবেই টের পাওয়া যায় না কুকুর আর খাসির মাংসের পার্থক্য৷

বেশ ফুরফুরে মন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি৷ নতুন ধরনের এসব খাবার খেয়ে অন্য রকম এক আনন্দ হচ্ছে৷ কারণ এসব খাবার তো আর সব জায়গায় পাওয়া যায় না৷ এসব ভাবতে ভাবতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম৷ এসেই মনে হলো - এখানে কোনো নতুন ধরনের খাবার পাব তো? কিছুটা দ্বিধা নিয়ে ক্যান্টিনে এসে বসলাম৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে আশপাশটা দেখে নিলাম৷ আশ্চর্য, সবাই খুব মজা করে ডাল খাচ্ছে৷ কেউ বাটিতে নিয়ে খাচ্ছে, কেউ ভাতের প্লেটে নিয়ে খাচ্ছে, কেউ চামচে নিয়ে খাচ্ছে, যে যেভাবে পারছে খাচ্ছে, শব্দ করে খাচ্ছে৷ সবার খাওয়ার শব্দে পেটের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল৷ সঙ্গে সঙ্গে একটা ক্যান্টিন বয়কে ডাকলাম৷ বয়টা কাছে আসতেই বললাম, এখানে স্পেশাল কী আছে?

আকর্ণ হাসি হেসে বয়টি বলল, ডাইল৷

ডাইল!

হ্যাঁ, ডাইল৷ তবে আপনি যে ডাইল মনে করেছেন সে ডাইল না, রান্না করে খাওয়ার ডাইল৷

এখানে এত কিছু থাকতে ডাইলটাই স্পেশাল কেন?

তা বলা যাবে না৷

বয়টি আর কিছু না বলে হন হন করে হেঁটে গেল অন্য একটা টেবিলে৷ সেখানে পুরো একবাটি ডাল শেষ করেছে একজন ছাত্র, আরও ডাল চায় সে৷ একটু পর বয়টা আরেক বাটি ডাল নিয়ে তার টেবিলের সামনে রাখল, সঙ্গে সঙ্গে সে চুমক দিয়ে খালি করে ফেলল বাটিটা৷ ডাল খাওয়া দেখতে দেখতে কেমন ডালের নেশা পেয়ে বসল আমাকে৷ ভাতের সঙ্গে আমি তাই পুরো তিন বাটি ডাল সাবাড় করে দিলাম৷ তারপর বাসায় এসে আরাম করে প্রথম আলোটা আবার পড়তে থাকি - চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলেই মসুর ডালের পরিবর্তে পরিবেশন করা হচ্ছে কম দামের বুটের ডাল, যা ‘ঘোড়ার খাবার’ নামে পরিচিত৷ খবরটা পড়ে বেশ জোরেসোরে একটা ঢেঁকুর দিলাম আমি, কিন্তু ঢেঁকুরের শব্দটা অবিকল ঘোড়ার ডাকের মতো শোনাল৷

রাতে খুব ভালো ঘুম হয়েছে৷ এবার ভালো একটা নাশতা করা দরকার৷ নাশতার কথা মনে হতেই শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে হলো, ওখানে নাকি বেশ ভালো নাশতা বানানো হয়৷ মনে একটা ফুর্তি ফুর্তি ভাব নিয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে পা রাখলাম৷ বয় এসে নাশতা দিয়ে গেল৷ নাশতার দিকে তাকিয়ে আনন্দে ভরে উঠল মনটা৷ পরোটা আর সবজির সঙ্গে দুটো রান্না করা তেলাপোকা সাজানো আছে প্লেটে! হুররে! তেলাপোকা দিয়ে নাশতা! কোনো দিন খাইনি৷

দুপুর হতেই মনটা বলে উঠল - আজ অন্য রকম কিছু একটা খাব৷ যা ভাবা তাই কাজ, চলে গেলাম পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে৷ আজ এখানে রান্না করা হয়েছে দশ দশটা মরা মুরগি! এ মুরগিগুলো ভালো মুরগির মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে এমন একটা তরকারি রেঁধেছে, কী আর বলব, মরা মুরগির মাংসের যে এত স্বাদ, জানতাম না৷

তারপর একদিন ...

খুনের দায়ে রুমানিয়ার পাভেল মির্চার ২০ বছর সাজা হলেও তিনি এই শাস্তি ভোগ করতে রাজি নন৷ তাঁর এক কথা, আমার অপরাধের দায়ভাগ ঈশ্বরকেও নিতে হবে, কারণ ব্যাপ্টিজমের সময় ঈশ্বরের সঙ্গে আমার চুক্তি হয়েছিল, তিনি সব ধরনের অশুভ কাজ থেকে আমাকে বিরত রাখবেন৷ কিন্তু তিনি চুক্তিভঙ্গ করেছেন, আমাকে সঁপে দিয়েছেন শয়তানের হাতে৷ আর সে শয়তানই হত্যাকর্মে প্ররোচিত করেছে আমাকে৷ সুতরাং ঈশ্বর চুক্তিভঙ্গ করেছেন৷ তাই ঈশ্বরের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ঠুকেছেন মির্চা৷

প্রতিদিন এত কিছু ভেজাল খাচ্ছি আমরা৷ ভেজাল খেতে খেতে যদি আমরা ভেজাল মানুষে পরিণত হই, যদি আমরা দুর্নীতিবাজ হই, কালোবাজারি হই, রাষ্ট্রের অর্থ লুণ্ঠনকারী হই, চোর হই, ডাকাত হই, তবে তার শাস্তি আমরা একা ভোগ করতে রাজি নই৷ আমরা প্রতিবছর কর দিই, সেই করের টাকায় রাষ্ট্রের কিছু মানুষ চলে, যাদের দায়িত্ব এসব দেখে রাখা, আমাদের ভালো রাখা৷ তারা ব্যর্থ, সুতরাং আমরাও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব৷

পাভেল মির্চার মামলা খারিজ করে দিয়ে রুমানিয়ার আদালতের এক মুখপাত্র জানান, অনেক চেষ্টা-তদবিরেও আমরা কোথাও ঈশ্বরের ঠিকানা খুঁজে পেলাম না, তাঁর কোনো আবাসিক ঠিকানাই নেই৷ সুখবর হচ্ছে - আমরা যাদের বিরুদ্ধে মামলা করব তাদের আবাসিক ঠিকানা তো আছেই, সরকারি জমি দখল করে তাদের তিন-চারটা করে বাড়ি আছে, তারা রাষ্ট্রের অর্থ মেরে ব্যাংকে কয়েক কোটি করে টাকা জমিয়েছে, কর ফাঁকি দিয়ে কয়েকটা করে দামি গাড়ির মালিক হয়েছে৷ মজার ব্যাপার হচ্ছে - অপ্রদর্শিত এ অবৈধ সম্পদগুলোর সবই বৈধ করা যাবে পরিপূর্ণ কর দিয়ে৷ যারা বেঁচে আছে ঈশ্বরের মতো, থাকবেও ঈশ্বরের মতো - ধরাছোঁয়ার বাইরে, নিরাপদে, আনন্দে!
 

এই গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে পড়তে অথবা ডাউনলোড করতে চাইলে ক্লিক করুন এখানে


   

মন্তব্যসমূহ (00)

এই গল্পটি সম্পর্কে আপনার যেকোন মতামত থাকলে তা ইমেইল করে জানান